শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বগুড়ায় ৭ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু, স্বজনদের আহাজারিতে শোকস্তব্ধ হাসপাতাল

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

বগুড়ায় ৭ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু, স্বজনদের আহাজারিতে শোকস্তব্ধ হাসপাতাল
ছবি: সংগৃহীত

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। জীবিকার তাগিদে, পরিবারের সদস্যদের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার অদম্য চেষ্টায় ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন একদল খেটে খাওয়া মানুষ। কেউ নিজেদের কৃষিজমিতে কাজ করার জন্য, আবার কেউবা দিনমজুরের কাজ খুঁজতে জড়ো হয়েছিলেন বগুড়া জেলার এরুলিয়া এলাকার কামলার হাটে।

 

তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল দিন শেষে সামান্য কিছু উপার্জন করে প্রিয়জনদের কাছে ফেরা। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে তাদের সেই জীবনসংগ্রাম চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। বেপরোয়া গতির একটি বাসের নিচে চাপা পড়ে নিভে যায় সাতটি তাজা প্রাণ।

 

এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগ এবং মর্গ এলাকায় এক হৃদয়বিদারক শোকের ছায়া নেমে আসে।

 

শুক্রবার, ৭ আগস্ট। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর সাড়ে পাঁচটা। বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের সদর উপজেলার এরুলিয়া সিলকিবান্ধা এলাকায় প্রতিদিনের মতোই কাজের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অসংখ্য কৃষি শ্রমিক।

 

ঠিক সেই সময়ে রাজধানী ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস হঠাৎ করেই নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। দ্রুতগতির বাসটি সরাসরি সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ সেই নিরীহ শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়।

 

ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনজন হতভাগ্য শ্রমিক। পরবর্তীতে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও অন্তত সতেরোজন, যারা বর্তমানে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

 

শুক্রবার দুপুরের দিকে হাসপাতালের আঙিনা ও বারান্দা জুড়ে কেবলই শোনা যাচ্ছিল স্বজন হারানো মানুষদের গগনবিদারী কান্না আর আর্তনাদ। একের পর এক নিথর দেহ দেখে উপস্থিত সবার চোখেই জল নেমে আসে।

 

নিহত স্বামী আবু সাঈদ মণ্ডলের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন স্ত্রী রিনা বেগম। কখনো তিনি স্বামীর মরদেহটি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কাঁদছিলেন, আবার কখনো প্রলাপ বকছিলেন, ‘আমাকে একদম একা রেখে তুমি কোথায় চলে গেলে?’

 

আশপাশে থাকা আত্মীয়স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু সদ্য বিধবা হওয়া এক নারীর বুকের ভেতরের সেই বিশাল শূন্যতা পূরণের কোনো ভাষাই যেন তাদের জানা ছিল না।

 

নিহত আবু সাঈদ এবং আমিরুলের এক আত্মীয় সানাউল প্রধান অশ্রুসিক্ত নয়নে জানান তাদের জীবনের করুণ বাস্তবতার কথা। তারা দুজনেই পেশায় ছিলেন দিনমজুর। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী সাঈদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয়জন, আর এই পুরো সংসারের ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল কেবল তার কাঁধেই।

 

কাজের সন্ধানেই তিনি ছুটে এসেছিলেন বগুড়ায়, কিন্তু তার আর নিজের বাড়িতে ফেরা হলো না। সানাউল আরও জানান, চল্লিশ বছর বয়সী নিহত আমিরুল ছিলেন একজন ভূমিহীন দরিদ্র মানুষ।

 

মাত্র এক শতক জমির ওপর ছোট একটি ছাপরা ঘর তুলে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে কোনোমতে দিন পার করছিলেন তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারের মুখে পতিত হলো।

 

এই দুর্ঘটনায় শুধু দিনমজুররাই নন, প্রাণ হারিয়েছেন স্থানীয় একজন প্রবীণ জমির মালিকও। ছিয়াত্তর বছর বয়সী নিহত নূর মোহাম্মদের ভাতিজা আল আমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার চাচা প্রতিদিনের মতো ফজরের নামাজ আদায় করে নিজের কৃষিজমির জন্য শ্রমিক নিতে কামলার হাটে গিয়েছিলেন।

 

কিন্তু কে জানত, প্রতিদিনের এই সাধারণ একটি কাজই তার জীবনের শেষ যাত্রায় পরিণত হবে! দুর্ঘটনা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া কৃষি শ্রমিক শফিকুল ইসলাম সেই হাটের প্রাত্যহিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রতিদিন ভোর পাঁচটার পর থেকেই এরুলিয়ার এই কামলার হাটে দেশের উত্তরের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত শ্রমিক জড়ো হন।

 

স্থানীয় কৃষিজমির মালিকরা তাদের নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী এখান থেকেই শ্রমিকদের মজুরির বিনিময়ে কাজে নিয়ে যান। নিহত ও আহত শ্রমিকদের অনেকেই অভাবের তাড়নায় জনপ্রতি মাত্র বিশ টাকা ভাড়ায় একটি ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে রাত্রিযাপন করতেন।

 

শফিকুল বলেন, প্রতিদিনের মতো শুক্রবার সকালেও তার সেখানে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে একটু দেরি হয়ে যায়। পরে সেখানে পৌঁছে তিনি দেখতে পান চারদিকে অসংখ্য মানুষের ভিড়, রক্তে ভেসে যাওয়া রাস্তা আর আহতদের করুণ আর্তনাদ। কালবিলম্ব না করে তিনিও আহতদের দ্রুত উদ্ধারে অন্যদের সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

 

মোশাররফ হোসেন সরকার নামের অপর একজন শ্রমিক জানান, উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য অভাবী মানুষ কাজের আশায় এই হাটে ছুটে আসেন। বর্তমানে সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর কৃষি কাজে একজন শ্রমিক দৈনিক প্রায় সাতশো টাকা মজুরি পেয়ে থাকেন।

 

এই সামান্য আয়ের ওপরই নির্ভর করে টিকে আছে হাজারো পরিবারের জীবন ও জীবিকা। জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পিষ্ট হয়ে ফেরা এই সাতজন মানুষ হলেন- সাতচল্লিশ বছর বয়সী তাজিমুল, বেল্লাল হোসেন, পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী আবু সাঈদ, পঞ্চান্ন বছর বয়সী আনারুল, চল্লিশ বছর বয়সী আমিরুল, পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী নূর আলম এবং জমির মালিক ছিয়াত্তর বছর বয়সী নূর মোহাম্মদ।

 

এই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলোর এমন অকাল মৃত্যু কেবল কয়েকটি পরিবারের স্বপ্নকেই ধূলিসাৎ করেনি, বরং দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।