ইসলামি বর্ষপঞ্জির নিয়ম অনুযায়ী, এই মাসের ১২ তারিখে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হয়। সেই নির্ভরযোগ্য হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২৬ আগস্ট, বুধবার সারা বাংলাদেশে অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, মর্যাদা ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপিত হবে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে আয়োজিত জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তারিত পর্যালোচনা সভায় এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই পর্যালোচনা সভায় দেশের আকাশসীমায় নতুন চাঁদ দেখার বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। ইসলামি শরিয়ত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সমন্বয়ে বাংলাদেশে চাঁদ দেখার যে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে, তা মেনেই এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির এই বিশেষ সভায় দেশের প্রতিটি জেলা প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়সহ সকল বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয় থেকে পাঠানো মাঠপর্যায়ের তথ্য গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়। দেশের কোথাও থেকে নতুন চাঁদ দেখার কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদ বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে কমিটির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
চাঁদ দেখার বিষয়ে নিখুঁত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কেবল সাধারণ দৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তার বিষয়টিকেও এই সভায় সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেশব্যাপী বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলো থেকে প্রাপ্ত আবহাওয়া ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপাত্ত এবং বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো)-এর বিশ্লেষণকৃত স্যাটেলাইট ও মহাকাশীয় তথ্যসমূহ বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সর্বস্তরের তথ্য, বৈজ্ঞানিক উপাত্ত এবং শরিয়তের বিধানের ভিত্তিতে দেশের আকাশে রবিউল আউয়াল মাসের নতুন চাঁদ দৃষ্টিগোচর না হওয়ার বিষয়টি সর্বসম্মতিক্রমে নিশ্চিত হওয়ার পরই কমিটি এই চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী নদভী, সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের পরিচালক ড. মু. মাহবুবুর রহমান।
এছাড়াও, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি দিকগুলোর সঠিক মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম এবং স্পারসোর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ শহিদুল ইসলামসহ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির অন্যান্য সম্মানিত সদস্যবৃন্দ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।
তাঁদের সম্মিলিত আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই ধর্মীয় সময়সূচি সমগ্র জাতির সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মতো বাংলাদেশেও পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং পবিত্র একটি দিন হিসেবে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে।
হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ ও বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাত দিবস। এই দিনটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কাছে গভীর আবেগ, অসীম শ্রদ্ধা এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের এক অনন্য প্রতীক।
ইসলাম ধর্মের প্রবর্তকের জীবনের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা একই দিনে সংঘটিত হওয়ায় দিনটিকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিশ্বে নানা ধরনের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও শিক্ষণীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।
রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বাংলাদেশে এই দিনটির এক বিশেষ ও অনন্য গুরুত্ব রয়েছে। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সারা দেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকার, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় চিন্তাবিদ ও পণ্ডিতগণ এই দিনটিতে বিশ্বশান্তি, সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবতার যে মহান বার্তা ইসলাম প্রচার করেছে, তা সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
দেশের প্রতিটি মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দিনব্যাপী কোরআন তিলাওয়াত, মিলাদ মাহফিল, বিশেষ মোনাজাত এবং নবীজির জীবন, দর্শন ও কর্মের ওপর বিস্তারিত আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
জাতীয় গণমাধ্যমগুলো, যেমন টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিও স্টেশনগুলো নবীজির জীবনীভিত্তিক বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে এবং জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রগুলো এই দিনের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।
সার্বিকভাবে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে আসন্ন রবিউল আউয়াল মাস ও পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালনের দিনক্ষণ সম্পর্কে সমগ্র দেশবাসীর কাছে একটি স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য বার্তা পৌঁছেছে।
কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট পবিত্র সফর মাসের ৩০ দিন পূর্ণ হবে এবং শনিবার, ১৫ আগস্ট থেকে রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম দিন হিসেবে পবিত্র এই মাসের গণনা শুরু হবে।
এর ফলে আগামী ২৬ আগস্ট, বুধবার সমগ্র বাংলাদেশ পরম শ্রদ্ধা, গভীর ভালোবাসা এবং যথাযথ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মহানবী (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এই পবিত্র দিনটি পালন করার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারবে।