বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি সরকারের এই কূটনৈতিক ও বাস্তবসম্মত অবস্থানের কথা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যে বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক অগ্রাধিকার ও রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততার একটি পরিষ্কার চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর ও ব্রিকস সম্মেলনে যোগদানের প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বর্তমান ব্যস্ততার কথা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে সরকার দেশের অভ্যন্তরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছে।
সামনেই দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশনের প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণভাবে সরকারের আরো অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব রয়েছে, যেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করার কাজ চলমান।
এই ধরনের বৃহৎ পরিসরের সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কাজের কারণে সরকার এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, রাষ্ট্রীয় এসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ততার মধ্যেও যদি সময় ও সুযোগের যথাযথ সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হয়, তবেই আন্তর্জাতিক সফরগুলো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার সর্বদা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকে। সময়ের সাথে সমন্বয় হলে শুধু ভারত নয়, জাপানসহ বিশ্বের অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোতেও প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে।
তবে যেকোনো আন্তর্জাতিক সফরের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর মহামূল্যবান সময়ের প্রাপ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বস্তুনিষ্ঠ অগ্রগতির ওপর। আলোচনা কাঙ্ক্ষিত দিকে অগ্রসর হলেই কেবল সফরের রূপরেখা চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং বিভিন্ন অমীমাংসিত প্রসঙ্গ নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে বলেন, যেকোনো দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যখন সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তখন দীর্ঘদিনের অনেক জটিল সমস্যারও কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশ সব সময়ই এই ধরনের গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ কাজে লাগাতে গভীরভাবে আগ্রহী এবং ভারতের দিক থেকেও এই সুযোগের যথাযথ সদ্ব্যবহার করা উচিত বলে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেন।
তবে একই সাথে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, একজন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি যখন ভারতের মাটিতে বসে স্বাধীনভাবে কথা বলে, তখন তা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ কোনোভাবেই ভালোভাবে গ্রহণ করে না।
সাম্প্রতিক সময়ের গণ-আন্দোলন ও জুলাই মাসের ঘটনাবলির প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত আবেগপূর্ণ অথচ পেশাদার সুরে বলেন, জুলাই মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি এখনো বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীরভাবে জাগ্রত রয়েছে।
অধিকার আদায়ের সেই সংগ্রামে রাজপথে ঝরে যাওয়া সাধারণ মানুষের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। সেই ঐতিহাসিক ও আবেগঘন জায়গা থেকে উভয় রাষ্ট্রকেই অত্যন্ত সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল ও সতর্ক আচরণ করতে হবে।
তবে তিনি প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এত কিছুর পরও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন একান্তে আলোচনার টেবিলে বসবেন, তখন নিশ্চয়ই অনেক অমীমাংসিত ও জটিল সমস্যার একটি সম্মানজনক ও গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসবে।
বাংলাদেশ সরকার আন্তরিকভাবে সেটাই প্রত্যাশা করে এবং ভারত সরকারও বাংলাদেশের মানুষের এই গভীর সংবেদনশীলতা ও আবেগের কথা বিশেষ গুরুত্বের সাথে মনে রাখবে বলে ঢাকা দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করে।
পরিশেষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম পুনরায় নিশ্চিত করেন যে, বর্তমান মুহূর্ত পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কোনো আন্তর্জাতিক সফরই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কাজে প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে চরম ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছেন।
তাই আসন্ন ভারত সফর থেকে শুরু করে অন্যান্য যেকোনো সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সফর-কোনো কিছুরই চূড়ান্ত দিনক্ষণ বা সিদ্ধান্ত এখনো সরকারিভাবে গৃহীত হয়নি। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও রীতিনীতি মেনে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সাথে বিস্তারিত ও ধারাবাহিক আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার পরই এই সফরগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন।