বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতায় বহু মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাদের দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হলে মোট নিহতের সংখ্যা ছয়ে পৌঁছায়। বর্তমানে হাসপাতালে বেশ কয়েকজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল দশটার দিকে ইয়ার্ডে থাকা একটি পুরোনো ও বাতিল জাহাজে পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করার সময় হঠাৎ জাহাজের ট্যাংক থেকে তীব্র বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হতে শুরু করে।
মুহূর্তের মধ্যেই সেই বিষাক্ত বাষ্প আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানে উপস্থিত অন্তত পনেরো থেকে বিশ জন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঘটনার পরপরই সহকর্মী ও স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
সেখানে প্রাথমিক অবস্থায় কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন এবং পরবর্তী সময়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন থাকা আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল আলম আশেক আনুষ্ঠানিকভাবে ছয়জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, হাসপাতালে নিয়ে আসা ছয়জনকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেছেন এবং বাকি অসুস্থদের প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে তিনজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তারা হলেন সানি দাস, পলাশ দাস ও মোহাম্মদ হাবিব। বাকি নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ভিন্ন দাবি করা হয়েছে। ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় শুক্রবার কারখানা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ছিল।
তবে সকাল দশটার দিকে কারখানায় থাকা একটি পুরোনো ও বাতিল এলএনজি জাহাজের ট্যাংকে হঠাৎ ছিদ্র দেখা দেয়। সে সময় আশপাশের বেশ কয়েকজন উৎসুক মানুষ বিষয়টি দেখতে গেলে তারা বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হন।
কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুজ্জামান জানান, সেখানে কোনো ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। মূলত গ্যাস লিক হয়ে বিষক্রিয়ার কারণেই এই প্রাণহানি ও অসুস্থতার ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগমও বিস্ফোরণের বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের বিষক্রিয়াকেই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং শ্রমিকদের জীবন সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে প্রশাসনিক তদন্ত শুরু হয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মাহবুবুল হাসান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কারখানায় শ্রমিকদের পেশাগত সুরক্ষাব্যবস্থা এবং সরকারি নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে মেনে চলা হচ্ছিল কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে কোনো ধরনের অবহেলা বা নিয়মলঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।