শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুকুরে গোসল করতে গিয়ে আপন দুই বোনসহ তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম

পুকুরে গোসল করতে গিয়ে আপন দুই বোনসহ তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায় পুকুরে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে আপন দুই বোনসহ তিন কন্যাশিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার, ১৪ আগস্ট দুপুরে উপজেলার জামদিয়া গ্রামে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে।

 

একসঙ্গে তিন শিশুর এমন অকাল মৃত্যুতে ওই অঞ্চলের মানুষের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গ্রামীণ জনপদে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর যে বৈশ্বিক ও জাতীয় উদ্বেগ রয়েছে, যশোরের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি যেন সেই বিষাদময় বাস্তবতারই আরও একটি করুণ দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে উঠে এসেছে।

 

স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ ইতোমধ্যে এই ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের বিবরণ অনুযায়ী, নিহত তিন শিশু হলো জামদিয়া গ্রামের নেছার আলীর দুই মেয়ে লামিয়া ও সুলতানা এবং একই গ্রামের বাসিন্দা আশিকুল ইসলামের মেয়ে ফাহিমা।

 

নিহতদের মধ্যে লামিয়ার বয়স তেরো বছর এবং তার ছোট বোন সুলতানার বয়স এগারো বছর। তাদের অপর সঙ্গী ফাহিমার বয়স মাত্র দশ বছর। গ্রামীণ পরিবেশের স্বাভাবিক চিত্র অনুযায়ী শুক্রবার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি পুকুরে তারা একসঙ্গে গোসল করতে যায়।

 

স্থানীয়ভাবে এটি ইকরাম মোল্লার পুকুর হিসেবে পরিচিত। তবে দীর্ঘক্ষণ পেরিয়ে গেলেও এই তিন শিশু নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যদের মাঝে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। শিশুদের ফিরে আসতে বিলম্ব দেখে একপর্যায়ে পরিবারের লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

 

চারদিকে সন্ধান করার একপর্যায়ে নিখোঁজ শিশুদের দাদি আরও কয়েকজন স্বজনকে সঙ্গে নিয়ে ওই পুকুরের দিকে অগ্রসর হন। সেখানে গিয়ে তারা এক মর্মান্তিক দৃশ্যের সম্মুখীন হন। তারা দেখতে পান পুকুরের পাকা সিঁড়ির নিচের অংশে তিন শিশুর নিথর দেহ পানিতে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে।

 

শিশুদের এমন অবস্থায় দেখতে পেয়ে পরিবারের সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন এবং দ্রুত তাদের পানি থেকে তুলে আনেন। শিশুদের অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে জরুরি ভিত্তিতে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

 

প্রতিবেশী চাচা মাহবুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে ঘটনার বিস্তারিত জানাতে গিয়ে বলেন, প্রতিদিনের স্বাভাবিক আচরণের মতোই শিশুগুলো বাড়ির পাশের ওই পুকুরটিতে গোসল করতে গিয়েছিল। তিনি আরও জানান যে, সাধারণত ওই পুকুরটিতে মানুষের আনাগোনা কিছুটা কম থাকে।

 

যারা সেখানে যান, তারা গোসল সেরে খুব দ্রুতই নিজেদের গন্তব্যে ফিরে আসেন। ফলে ঘটনার সময় পুকুরের আশেপাশে অন্য কোনো বয়স্ক মানুষের উপস্থিতি না থাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটার সময় কেউ তাদের সাহায্য করার সুযোগ পায়নি। নির্জনতার কারণেই মূলত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার সময় শিশুগুলোর আর্তনাদ কারও কানে পৌঁছায়নি বলে স্থানীয়দের ধারণা।

 

উদ্ধারকৃত তিন শিশুকে বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মাসনুন আব্দুল্লাহ এই মর্মান্তিক ঘটনার চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি জানান, দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে ওই তিন শিশুকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তাদের প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় তাদের শরীরে কোনো হৃদস্পন্দন বা প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

 

পানিতে দীর্ঘক্ষণ ডুবে থাকার ফলে ফুসফুসে পানি প্রবেশ করে শ্বাসরোধ হয়েই তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

 

ঘটনার খবর পেয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বাঘারপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ জালাল আলম পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যুর এই দুঃখজনক খবরের সত্যতা সংবাদমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি জানান, এমন একটি হৃদয়বিদারক সংবাদ পাওয়ার পরপরই পুলিশ প্রশাসনের একটি দলকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে প্রেরণ করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি কীভাবে ঘটলো এবং এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

 

একই গ্রামের তিন শিশুর, বিশেষ করে একটি পরিবারের আপন দুই বোনের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে জামদিয়া গ্রামজুড়ে এক অবর্ণনীয় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার বাতাস। শিশুগুলোর পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না প্রতিবেশীরা।

 

উল্লেখ্য, নদীমাতৃক বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে উন্মুক্ত জলাশয়ে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা একটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দীর্ঘকাল ধরেই চিহ্নিত। মূলত সাঁতার না জানা এবং শিশুদের প্রতি সার্বক্ষণিক নজরদারির অভাবই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ।

 

বাঘারপাড়ার এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করলো যে, গ্রামীণ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পারিবারিক সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা কতটা জরুরি। এই শোকাবহ ঘটনাটি সমগ্র সমাজের জন্যই এক গভীর সতর্কবার্তা রেখে গেল।