এর ফলে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা এবং সার্বিক গণপরিবহনে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। জ্বালানির অভাবে সড়কগুলোতে যানবাহনের সংখ্যা আকস্মিকভাবে কমে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রী এবং পরিবহন শ্রমিকরা এক অবর্ণনীয় ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস সংকট হঠাৎ তৈরি না হলেও গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছিল। জেলায় দৈনিক গ্যাসের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ পাঁচটি অনুমোদিত ফিলিং স্টেশনে বরাদ্দ রেখেছিল মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার, যা চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
পাশাপাশি সরবরাহ লাইনে গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ বা প্রেসার মারাত্মকভাবে কমে যায়। নিয়ম অনুযায়ী ফিলিং স্টেশনগুলোতে যেখানে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ১৫ পিএসআই চাপে গ্যাস সরবরাহের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেখানে স্টেশনগুলো পাচ্ছিল মাত্র ৩ থেকে ৪ পিএসআই চাপ।
এমন পরিস্থিতিতে গত বুধবার থেকে সরবরাহ আরও সীমিত হয়ে পড়ে এবং সবশেষে বৃহস্পতিবার রাত থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলা শহর ও আন্তঃউপজেলা রুটে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
জীবিকার তাগিদে অল্পসংখ্যক চালক তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করে গাড়ি চালু রাখলেও এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। জ্বালানি পরিবর্তনের কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার অজুহাতে যাত্রীদের কাছ থেকে প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এতে করে কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ পথচারীদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, জরুরি প্রয়োজনে বের হয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে যাত্রীদের।
আবুল কাশেম নামের এক ভুক্তভোগী যাত্রী জানান, জেলা শহরের কুমারশীল মোড় থেকে নন্দনপুর বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় যাওয়ার জন্য দীর্ঘ এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সহজে কোনো বাহন মেলেনি।
পরবর্তীতে একটি অটোরিকশা পাওয়া গেলেও চালক নিয়মিত ৪০ টাকার ভাড়ার বিপরীতে সরাসরি ৮০ টাকা দাবি করেন। দীর্ঘ সময় দরকষাকষির পর শেষ পর্যন্ত ৭০ টাকায় যাতায়াত করতে বাধ্য হন তিনি।
অন্যদিকে পরিবহন চালকরাও নিজেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরছেন। শহরের কুমারশীল মোড় থেকে সরাইল-বিশ্বরোড রুটের নিয়মিত অটোরিকশাচালক জনি মিয়া জানান, স্বাভাবিক সময়ে এই দীর্ঘ রুটের যাত্রীপ্রতি নির্ধারিত ভাড়া ৫০ টাকা।
তবে কয়েক দিন ধরে গ্যাস সংকটের কারণে লাইনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হওয়ায় ভাড়া বাড়িয়ে ৭০ টাকা করতে হয়েছিল। পরবর্তীতে গ্যাস না পেয়ে বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার সংযোজন করে গাড়ি চালানোর কারণে এখন ৯০ টাকা করে ভাড়া না নিলে তাঁদের জ্বালানি খরচ ও দৈনিক জমার টাকাই উঠছে না। ফলে ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ফিলিং স্টেশনগুলোর পরিচালনাকারীরাও। সরাইল এলাকার সোপান ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক আজিজুল হক জানান, বুধবার থেকেই তাঁদের স্টেশনে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
তীব্র সংকটের কারণে যানবাহনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না বিধায় তাঁরা স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। বিতরণকারী কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের বরাতে তিনি উল্লেখ করেন, আগামী সপ্তাহের রবি অথবা সোমবার নাগাদ হয়তো পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
জ্বালানি সংকটের সামগ্রিক বিষয়ে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল হক জানিয়েছেন, মূলত জাতীয় পর্যায়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
এই ঘাটতির কারণে স্থানীয় ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনও সংকট নিরসনের কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।