রামপুরা টেলিভিশন কেন্দ্র থেকে হাজীপাড়া সিএনজি সরবরাহ কেন্দ্র পর্যন্ত মাত্র এক দশমিক এক কিলোমিটার দূরত্বের পথ পাড়ি দিয়ে গ্যাস সংগ্রহ করতে একটি গাড়িকে অন্তত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুপুর সাড়ে বারোটায় গ্যাসের জন্য লাইনে অপেক্ষমাণ একজন চালক দীর্ঘ চার ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে চারটায় গ্যাস পেলেও, তা চাহিদার তুলনায় ছিল একেবারেই নগণ্য।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর মাত্র ৫০২ টাকার গ্যাস মিলেছে, যা ওই গাড়ির সিলিন্ডারের ধারণক্ষমতার মাত্র ষাট শতাংশ। রামপুরা ও হাজীপাড়া এলাকার সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় একদিকে যেমন যানজট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে চালকদের মূল্যবান কর্মঘণ্টার একটি বড় অংশ কেবল গ্যাস সংগ্রহেই নষ্ট হচ্ছে।
পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক চালককে দিনে দুইবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হতে হচ্ছে। ফলে কেবল গাড়ির জ্বালানি সংগ্রহ করতেই তাঁদের প্রতিদিন আট থেকে দশ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে চালকদের দৈনিক আয় মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে এবং এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নগরীর সার্বিক গণপরিবহন ব্যবস্থায়।
ব্যক্তিগত গাড়ির চালক তামিম তাঁর হতাশা ব্যক্ত করে জানান, আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি মাত্র আধা কিলোমিটার সামনে এগোতে পেরেছেন। তাঁর গাড়িতে সাধারণত ৬০০ টাকার গ্যাস প্রয়োজন হলেও, সরবরাহ কেন্দ্রে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কম থাকায় সর্বোচ্চ ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকার গ্যাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এর ফলে তাঁর দৈনিক উপার্জন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। অন্যদিকে, অটোরিকশাচালক জামালও একই ধরনের সংকটের কথা তুলে ধরেন। স্বাভাবিক সময়ে ৩৫০ টাকার গ্যাসে সারা দিন নির্বিঘ্নে গাড়ি চালানো গেলেও, বর্তমানে মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ টাকার গ্যাস পাওয়ায় দুই-তিনটি ভাড়ার পরই তাঁকে পুনরায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে এসে দাঁড়াতে হচ্ছে।
এতে পরিবার নিয়ে দৈনন্দিন জীবনযাপন করা তাঁদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্র বা ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষও এই চলমান সংকটের কারণে ব্যাপক মাত্রায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। হাজীপাড়া সরবরাহ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, চারটি সরবরাহ নলের বা নোজলের মধ্যে দুটি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
চালু থাকা বাকি দুটি নল দিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে গাড়িগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যার ফলে অপেক্ষার সারি রামপুরা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সরবরাহ কেন্দ্রের কর্মীরা জানান, বর্তমানে গ্যাসের চাপ রয়েছে মাত্র ১৮০ বার, যেখানে স্বাভাবিকভাবে গাড়িতে পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় গ্যাস সরবরাহের জন্য ২১০ থেকে ২৫০ বার চাপের প্রয়োজন হয়।
গ্যাসের এই চরম নিম্নচাপের কারণে গাড়িতে চাহিদানুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। অথচ, অত্যন্ত সীমিত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হলেও কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক কম্প্রেসার মেশিন আগের মতোই পূর্ণ শক্তিতে চালাতে হচ্ছে।
এর ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গ্যাস বিক্রি না হলেও বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য পরিচালনা ব্যয় বিন্দুমাত্র কমছে না, যা স্টেশন মালিকদের ধীরে ধীরে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের এই তীব্র ও চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বৃহস্পতিবার ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারের অবস্থান ও সংকটের কারণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক মানের সেমিনারে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সমুদ্রে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ-এর মেরামত কাজ ছাড়া এই মুহূর্তে সরকারের হাতে আর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এই টার্মিনাল মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, মেরামত কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর কারিগরি সমন্বয়ের স্বার্থে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করার জন্য পুরো গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে টানা তিন দিন বা বাহাত্তর ঘণ্টা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে।
এর ফলে আগামী দিনগুলোতে দেশজুড়ে গ্যাসের সংকট আরও ভয়াবহ ও তীব্র আকার ধারণ করবে বলে মন্ত্রী নিজে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পকারখানায় ন্যূনতম গ্যাস সরবরাহ সচল রাখা এবং লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখাই কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও বেশ কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।