শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নুসরাত হত্যা মামলা: অধ্যক্ষ সিরাজসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্টের রায়!

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ০১:৫০ পিএম

নুসরাত হত্যা মামলা: অধ্যক্ষ সিরাজসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্টের রায়!
ছবি: সংগৃহীত

ফেনীর সোনাগাজীর চাঞ্চল্যকর ও বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ।

 

সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক ও বহুল প্রতীক্ষিত রায় প্রদান করেন। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ মোট দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে।

 

একইসঙ্গে আদালত চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর দশ আসামিকে মামলা থেকে বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন। এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি মর্মান্তিক ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণাত্মক মানদণ্ড অনুযায়ী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নুসরাত জাহান রাফির এই হত্যাকাণ্ডটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধমূলক ঘটনাই ছিল না, বরং এটি ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো নিরাপদ আশ্রয়ে চরম নির্মমতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়ানক দৃষ্টান্ত।

 

নথিপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নুসরাতকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে তার শ্লীলতাহানি করেন।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপমানজনক ঘটনার পর নুসরাত ও তার পরিবার ভয় না পেয়ে সাহসিকতার সঙ্গে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করে।

 

তবে অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তার অনুসারী ও প্রভাবশালী মহল নুসরাত ও তার পরিবারের ওপর মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রচণ্ড মানসিক চাপ, ভয়ভীতি ও হুমকি প্রয়োগ করতে থাকে। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে অস্বীকৃতি জানানোর চরম মূল্য দিতে হয় মাত্র ১৮ বছর বয়সী এই সাহসী তরুণীকে।

 

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সকালে আলিম (উচ্চ মাধ্যমিক সমমান) পরীক্ষা দিতে নুসরাত মাদ্রাসায় গেলে তাকে সুকৌশলে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা বোরকা পরিহিত কয়েকজন দুর্বৃত্ত নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়।

 

তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে অত্যন্ত নৃশংসভাবে তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অপরাধীদের মূল লক্ষ্য ছিল ঘটনাটিকে একটি আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দিয়ে নিজেদের আইনি শাস্তির হাত থেকে রক্ষা করা।

 

কিন্তু অগ্নিদগ্ধ অবস্থাতেও নুসরাত তার অসীম সাহসিকতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দেন। শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি পুলিশ ও চিকিৎসকদের কাছে দেওয়া মৃত্যুশয্যার জবানবন্দিতে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার নির্দেশ এবং তার সহযোগীদের নির্মমতার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন।

 

তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে টানা পাঁচ দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে নিরলস পাঞ্জা লড়ে অবশেষে ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

তার এই অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো বাংলাদেশকে গভীরভাবে শোকাহত ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। এই ভয়াবহ অগ্নিসন্ত্রাসের ঘটনার পরপরই নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন, যা পরবর্তীতে নুসরাতের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর একটি পূর্ণাঙ্গ হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

 

ঘটনাটি দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, যা দেশজুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে ব্যাপক জনমত গঠন করে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মানবাধিকারকর্মীরা রাস্তায় নেমে আসেন এবং দোষীদের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হন।

 

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নুসরাতের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সমাজে অপরাধীদের নেটওয়ার্ক কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তবে একই সাথে এটিও প্রমাণ করে যে, সত্য এবং সাহসের কণ্ঠস্বরকে আগুনে পুড়িয়ে নিঃশেষ করা যায় না।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও নারী অধিকার সনদের আলোকে এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি স্পষ্টভাবে বার্তা দেয় যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র স্থানে কোনো শিক্ষক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন চালায়, তবে তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে।

 

আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘ ও জটিল পথপরিক্রমায় নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত এই মামলার বিচারকার্য অত্যন্ত গুরুত্ব, স্বচ্ছতা ও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে। হাইকোর্টের এই সাম্প্রতিক রায়ে ঘটনার মূল হোতা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হওয়ায় ন্যায়বিচারের পথে একটি শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছেছে বলে মনে করছেন আইন ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা।

 

একইসঙ্গে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ১০ জন আসামির খালাস পাওয়ার বিষয়টি আদালতের নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়ারই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। একটি স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ বিচারব্যবস্থায় আবেগ নয়, বরং অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় প্রদান করা হয়, যা এই রায়েও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

 

নুসরাত জাহান রাফির এই অসামান্য আত্মত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার আপসহীন সংগ্রাম বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীদের অধিকার আদায় এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি চিরস্থায়ী প্রতীক হিসেবে অনন্তকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।