শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গুমের শিকার নিশ্চিতে যুগান্তকারী আইন আনছে সরকার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৩ এএম

গুমের শিকার নিশ্চিতে যুগান্তকারী আইন আনছে সরকার
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও শাসনব্যবস্থার পালাবদলের পর বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার।

 

অতীতের অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবার যাতে আইনি সুরক্ষার আওতায় বিচার পায়, তা নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইন প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

 

শনিবার, ২৯শে আগস্ট, রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত এক বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও মর্মস্পর্শী আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে বলেন, এ দেশের অকুতোভয় জনগণ এক দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক ও নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থা থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করেছে। এই স্বাধীন পরিবেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 

গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে যে নতুন আইনি কাঠামো প্রস্তুত করা হচ্ছে, তার মূল উদ্দেশ্য হলো অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেওয়া।

 

পূর্ববর্তী গুম সংক্রান্ত তদন্ত পর্ষদগুলোতে ভুক্তভোগীদের সরাসরি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার যে সীমাবদ্ধতা ছিল, নতুন আইনে তা দূর করা হয়েছে। এখন থেকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার সরাসরি বিচারিক আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে আইনি লড়াই চালাতে পারবেন।

 

ইতিমধ্যে এই প্রস্তাবিত আইনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিকার আইন, ২০২৬’ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ কিছু যুগান্তকারী ধারার কথা উল্লেখ করেন।

 

এই আইনে গুমের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী অপরাধীদের শাস্তির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়া কে বা কারা পরিচালনা করবে এবং এর স্বচ্ছতা কীভাবে বজায় রাখা হবে, তারও সুস্পষ্ট নির্দেশনা এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 

এই আইনের সবচেয়ে মানবিক দিকটি হলো ভুক্তভোগী পরিবারের সম্পত্তি ও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা। যদি গুমের শিকার কোনো ব্যক্তিকে চূড়ান্তভাবে খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে আইন অনুযায়ী তাঁর উত্তরাধিকারীরা যেন বিনা বাধায় রেখে যাওয়া সম্পদের মালিকানা লাভ করতে পারেন, সেই আইনি বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

 

এমনকি অপরাধীরা যদি আর্থিকভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে অক্ষম হয়, তবে একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসেবে সরকার নিজেই সেই ক্ষতিপূরণের দায়ভার গ্রহণ করবে। আইনি কাঠামোতে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে যেকোনো সময় এটি সংশোধন করা সম্ভব, তবে এই মুহূর্তে দেশে এমন একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি।

 

সম্পূর্ণ আলোচনায় একটি অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়, যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই একজন গুমের শিকার ব্যক্তি হিসেবে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পদে থাকলেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই নির্মম বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছেন।

 

একজন ভুক্তভোগী হিসেবে তিনি নিজেই চান গুমের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী আইনি কাঠামো গড়ে উঠুক। এখানে সরকারের বা তাঁর নিজের কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থ নেই।

 

রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং বর্তমান সরকার ভবিষ্যতে ক্ষমতায় না-ও থাকতে পারে, কিন্তু এই আইনটি চিরকাল টিকে থাকবে এবং গুমের শিকার যেকোনো নাগরিকের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথকে প্রশস্ত করবে।

 

অতীতের সরকারগুলোর আমলে গুমের শিকার ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি যে নির্মম অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়েছে, তার তীব্র সমালোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, বিগত কয়েক বছর ধরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে চরম অবহেলা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয়েছে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।

 

গুমের মতো একটি স্পর্শকাতর ও মর্মান্তিক বিষয়কে কেন্দ্র করে যে অপসংস্কৃতি ও উপহাসের চর্চা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন। নিজে এবং আরেকজন ভুক্তভোগী হুম্মাম কাদেরের জীবিত ফিরে আসার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তাঁরা নিজেরাও কখনো ভাবতে পারেননি যে এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতে পারবেন।

 

গুম থেকে ফিরে আসা মানুষদের বেঁচে থাকা নিয়ে যেকোনো ধরনের উপহাস বা কটূক্তি কেবল তাঁদের যন্ত্রণাকেই বাড়ায় না, বরং ভবিষ্যতের যেকোনো ন্যায়সঙ্গত ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকেও গভীরভাবে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে। তাই মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী এই অপরাধের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য ও স্থায়ী আইনি সমাধান এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।