মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত এই জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে সরকার নতুন আইনি কাঠামো প্রণয়ন করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিগত স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে গুমকে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ওই সময়ে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে অপহরণ করে যেসব গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা হতো, তা জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
দেশি ও বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নির্ভরযোগ্য হিসাব উদ্ধৃত করে তিনি জানান, বিগত সরকারের শাসনামলে অন্তত সাত শতাধিক মানুষকে গুম করা হয়েছে, যা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক।
জোরপূর্বক গুম বা ‘এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’-কে বিশ্বের নিকৃষ্টতম ও ভয়ংকর অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করে তারেক রহমান বলেন, এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীর বৈশ্বিক সংকট। মূলত স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতেই এ ধরনের অমানবিক ঘটনার প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে যখন সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন বা ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নিশ্চিহ্ন করার কাজে বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হয়, তখনই এমন নির্মম ও নিষ্ঠুর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের পতিত, পরাজিত ও বর্তমানে পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকারও দেশের আপামর জনসাধারণের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করার হীন উদ্দেশ্যেই এই গুম-অপহরণের অমানবিক পথ বেছে নিয়েছিল।
মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে গুমের শিকার ব্যক্তিদের আটক রাখার জন্যই সেই কুখ্যাত গোপন বন্দিশালাগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এই মানবতাবিরোধী অপরাধের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের আইনি পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে গুম বা অপহরণের মতো ঘটনা চিরতরে বন্ধ করতে একটি কার্যকর ও পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সরকার কর্তৃক উত্থাপিত এই বিলগুলো যথাযথ নিয়মে আইনে পরিণত হলে, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত কোনো পর্যায়েই আর কেউ গুম বা অপহরণের মতো জঘন্য অপরাধের পথ বেছে নেওয়ার সাহস পাবে না।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় বলেন, গুম বা অপহরণ কেবল কাগজে-কলমে থাকা একটি সংখ্যা নয়, কিংবা এটি কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া নয়।
এটি মূলত একটি গোটা পরিবারের স্বপ্ন, সাধ ও আকাঙ্ক্ষার নির্মম মৃত্যু। একজন মানুষের গুম হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো সেই পরিবারের ভবিষ্যৎ চিরতরে থমকে যাওয়া। গুম হয়ে যাওয়া মানুষের পথ চেয়ে অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের প্রতিটি দিন কাটে এক নিদারুণ ও অনিশ্চিত বাস্তবতায়।
এই অপেক্ষার কোনো সমাপ্তি নেই, এমনকি স্বজন হারানোর স্বাভাবিক শোক পালনের সুযোগটুকুও তাঁদের থাকে না। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে বীর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট চক্রের চূড়ান্ত পতন ঘটে।
এই পটপরিবর্তনের পর বন্দিশালা থেকে গুমের শিকার সৌভাগ্যবান কয়েকজন ফিরে এলেও, অনেকেরই আজও কোনো সন্ধান মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, নিখোঁজ হওয়া ইলিয়াস আলী কিংবা চৌধুরী আলমের মতো অসংখ্য মানুষের খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সনদের ৭(২) অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সনদে গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং এর দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত রাখার লক্ষ্যেই সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য হলো ‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’ অর্থাৎ ‘ভুক্তভোগীরাই প্রথম, এখনই পদক্ষেপ নিন’।
বাণীর শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী এই মনুষ্যত্বহীন ও নির্মম অপরাধের সাথে জড়িত সব ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোর সুষ্ঠু বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে ঐক্য ও গভীর সংহতি গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানান।