মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরতে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে দেশে কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য সারের মজুত নিয়েও কৃষকদের আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
উপদেষ্টা নিশ্চিত করেছেন যে, গত বছরের ঠিক এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে দেশে সারের মজুত অনেক বেশি সুরক্ষিত ও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। কৃষিখাতে সারের সরবরাহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান জানান যে, সারের ঘাটতি নিয়ে বর্তমানে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
মূল সমস্যা মজুতে নয়, বরং সরবরাহ ও বিতরণ প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে কিছুটা কারিগরি ও ব্যবস্থাপকীয় ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। সরকার ইতোমধ্যে সেই ত্রুটি চিহ্নিত করেছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিতরণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
গত বছরের তুলনায় এ বছর সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় আসন্ন কৃষি মৌসুমে কৃষকদের কোনো ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হবে না বলে তিনি নিশ্চিত করেন। দেশজুড়ে চলমান বিদ্যুৎ সংকট এবং লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা করেন।
তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন যে, বর্তমানে দেশজুড়ে যে পরিমাণ লোডশেডিং হচ্ছে, তা খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দারা সাম্প্রতিক সময়ে যে মাত্রায় লোডশেডিংয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন, তা অতীতের তুলনায় দৃশ্যত বেশি মনে হলেও এর পেছনে সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট ও জনকল্যাণমুখী নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে।
অতীতে কেবল রাজধানী ঢাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য গ্রামাঞ্চল ও প্রান্তিক জনপদের ওপর লোডশেডিংয়ের পুরো বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই বৈষম্যমূলক অবস্থান থেকে সরে এসে সংকটকালীন এই বিদ্যুতের ঘাটতি সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেওয়ার একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
রাজধানীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রসঙ্গে তিনি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, একটি বড় শহর বা রাজধানীতে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করার অর্থ এই নয় যে সেখানে কেবল প্রভাবশালী বা বিত্তবান মানুষেরা বসবাস করেন।
বরং বড় শহরগুলোতে জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং বৃহৎ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় বলেই সেখানে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ বজায় রাখা জরুরি হয়ে পড়ে। নীতিগতভাবে এই প্রবণতা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হলেও, যেহেতু বর্তমান সরকার বৈষম্যহীন বণ্টনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই রাজধানীর নাগরিকদেরও এখন লোডশেডিংয়ের এই কষ্ট ভাগ করে নিতে হচ্ছে।
গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের এই সুষম বণ্টন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ঢাকায় এখন আগের চেয়ে বেশি লোডশেডিং পরিলক্ষিত হচ্ছে। অতীতের সরকারগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ নীতির কড়া সমালোচনা করে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার এবং তৎপরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের যে চটকদার দাবি করা হয়েছিল, তার প্রকৃত সত্যতা শিগগিরই জনগণের সামনে উন্মোচন করা হবে।
ওই সময়গুলোতে বাস্তবে ঠিক কী পরিমাণ লোডশেডিং হয়েছিল এবং কত মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল, সেই সম্পর্কিত বিস্তারিত ও সঠিক তথ্য-উপাত্ত আগামী সপ্তাহের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, অতীত সরকারগুলো তাদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষার্থে লোডশেডিংয়ের বড় অংশটি অত্যন্ত সুকৌশলে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল।
বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সেই বৈষম্যমূলক জায়গা থেকে সম্পূর্ণ সরে এসেছে এবং সাধারণ মানুষ সরকারের এই সমতাভিত্তিক নীতিটি অনুধাবন করতে সক্ষম হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হওয়ার মূল কারণগুলোও তিনি সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট, বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের বিলম্ব, জাতীয় সঞ্চালন লাইনের কারিগরি সীমাবদ্ধতা এবং সর্বোপরি বিদ্যুতের দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদার কারণেই মূলত এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটটি তৈরি হয়েছে।
তাছাড়া দেশে একটি নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মানুষের মধ্যে নতুন করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির যে স্বাভাবিক প্রবণতা তৈরি হয়, তার ফলেও বিদ্যুতের অতিরিক্ত ও আকস্মিক চাহিদা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তুলনামূলকভাবে বেশ কম ছিল।
চলমান এই বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে যেসব কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা একটি সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং এড়ানোর লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর আওতাধীন এলাকাগুলোতে সুপরিকল্পিতভাবে লোডশেডিং সমন্বয় করা হচ্ছে।
রাজধানী থেকে সাশ্রয় করা এই মূল্যবান বিদ্যুৎ বর্তমানে গ্রামাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পকারখানা ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকশ্রেণির মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হচ্ছে। এর ফলে ঢাকার বাইরের শিল্পকারখানাগুলোতে যেমন উৎপাদন স্বাভাবিক হচ্ছে, তেমনি গ্রামাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের কষ্টও বহুলাংশে লাঘব হচ্ছে।
পরিশেষে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, জাতি বর্তমানে একটি সাময়িক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এই সংকটের কষ্ট কমবেশি সবাইকে ধৈর্য্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। তবে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগের ফলে এই কষ্ট খুব দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।