শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি খাত এখন আর কেবল চ্যালেঞ্জ নয়, এক গভীর সংকট

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

জ্বালানি খাত এখন আর কেবল চ্যালেঞ্জ নয়, এক গভীর সংকট
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান অবস্থাকে নিছক কোনো চ্যালেঞ্জ বলার আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই; বরং এটি দিন দিন একটি গভীর ও বহুমুখী জাতীয় সংকটে রূপান্তরিত হচ্ছে।

 

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকার ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) ডিএমকে লেকচার গ্যালারিতে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় এমন উদ্বেগজনক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) প্রশাসন ও অর্থ বিষয়ক সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম।

 

‘ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের প্রমাণভিত্তিক পথ: নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ ও ইনভেন্টরি স্টাডির ফলাফল উপস্থাপন’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই জাতীয় সংকটের সমাধান কোনো একক প্রতিষ্ঠান কিংবা শুধুমাত্র সরকারের একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের জন্য সরকার, শিল্প খাত, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে একযোগে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

 

দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান আমদানিনির্ভরতার ভয়াবহতা তুলে ধরে ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, অতীতের সরকারগুলোর নানাবিধ সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে সেই পুরনো সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো সুযোগ নেই।

 

প্রায় বিশ কোটি মানুষের এই বিপুল জনসংখ্যার দেশে জ্বালানির বাজার এখন প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের মোট আমদানির একটি বিশাল অংশজুড়ে ছিল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্য।

 

বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত পেট্রোলিয়ামের প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০১৫ সালে যেখানে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা দশ শতাংশেরও কম ছিল, সেখানে বর্তমানে তা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় সাতষট্টি শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

 

এই বিপুল ও ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করতে হলে দেশীয় খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অপার সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক উপায়ে ও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই।

 

জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে দেশের কৃষি খাতকে একটি অনুকরণীয় ও সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন এই গবেষক। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বাধীনতার ঠিক পরপর সাড়ে সাত কোটি মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা পূরণ করাই ছিল রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

 

কিন্তু নিরলস গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে কৃষিবিদদের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার এক গৌরবময় পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।

 

ঠিক একই ধরনের গবেষণাভিত্তিক, বিজ্ঞানসম্মত ও বাস্তবমুখী মডেল এখন দেশের জ্বালানি খাতে প্রয়োগ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি রয়েছে এক বিশাল ও সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ, যার সঙ্গে যুক্ত আছে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত ও দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিমেয় সক্ষমতা।

 

তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, বর্তমানে শিল্প খাত, শিক্ষাঙ্গন এবং সরকারি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয়ের এক বিশাল ঘাটতি বিরাজ করছে। সঠিক ও নির্ভরযোগ্য সমন্বিত তথ্যের অভাব জাতীয় পর্যায়ের যেকোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে জানান বিইপিআরসির এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

 

এই সমস্যা নিরসনে একটি আন্তর্জাতিক মানের সমন্বিত কেন্দ্রীয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ তথ্যকেন্দ্র গঠনের যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই কেন্দ্রের মাধ্যমে জ্বালানি খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করে একটি একক উৎস থেকে মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

 

এর পাশাপাশি জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমস্যা সমাধানে গবেষণা এবং বাস্তব সমীক্ষাভিত্তিক নীতি গ্রহণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয় কিংবা সঠিক নির্দেশনার অভাবে বিশাল অঙ্কের তহবিল অব্যবহৃত অবস্থায় ফেরত যায়।

 

অথচ দেশের প্রকৃত বাস্তবতা বিবেচনা করে স্থানীয় গবেষক ও দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কাজে লাগানো হলে তুলনামূলক অনেক কম ব্যয়ে অত্যন্ত কার্যকর ও যুগান্তকারী গবেষণা সম্পন্ন করা সম্ভব। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোটি কোটি টাকা দিয়ে গবেষণা করানোর দীর্ঘদিনের যে নির্ভরতা, তা কমিয়ে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।

 

একাডেমিক গবেষণার উদ্দেশ্য সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়ে ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে কেবল আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা কিংবা ব্যক্তিগত পেশাগত পদোন্নতির সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং তা দেশের সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধানে সরাসরি প্রয়োগ করতে হবে।

 

সরকারের বিভিন্ন দপ্তর এবং শিল্প খাতের প্রকৃত সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেই সমস্যা সমাধানের দায়িত্বে যুক্ত করা গেলে অভাবনীয় সুফল পাওয়া সম্ভব।

 

এর জন্য গবেষকদের প্রয়োজনীয় গবেষণাগার, আর্থিক অনুদান, বিশেষজ্ঞ সহায়তা এবং অন্যান্য কাঠামোগত সুবিধাসহ একটি কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিবেশ গড়ে তুলতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় পরিবেশবান্ধব খাতে দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব অর্পণ করা যেতে পারে।

 

সরকারের বাস্তব চাহিদা, শিল্প খাতের সক্ষমতা এবং শিক্ষাঙ্গনের গবেষণার মধ্যে একটি নিবিড় ও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে পারলেই জ্বালানি খাত বর্তমানের এই গভীর সংকট থেকে বেরিয়ে একটি স্বনির্ভর ও টেকসই ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে পারবে।

 

অনুষ্ঠানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন। এছাড়া ‘বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ইনভেন্টরি’ এবং ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ সমীক্ষা’ বিষয়ে তথ্যবহুল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইইউবির গবেষক মোহাম্মদ রেজওয়ান উদ্দিন এবং অধ্যাপক খসরু মোহাম্মদ সেলিম। অনুষ্ঠানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধি, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।