মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কথা জানান। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সবসময়ই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের এই সম্ভাব্য সফর দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংবাদ সম্মেলনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি ভারতের সাম্প্রতিক একটি পদক্ষেপকে ঢাকার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা হিসেবে আখ্যায়িত করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গত ২৯ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে নিষিদ্ধঘোষিত দল আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিল।
তবে শেষ মুহূর্তে দিল্লি পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপে ও আনুষ্ঠানিক আপত্তির কারণে আয়োজকরা ওই বিতর্কিত সেমিনারটি বাতিল করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ সরকার ভারতের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
হুমায়ূন কবির মনে করেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের এ ধরনের কার্যক্রমে ভারত সরকারের অনুমতি না দেওয়াটা দুই দেশের মধ্যকার চলমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বলিষ্ঠ ও ইতিবাচক কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে, ভারত সরকার বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক প্রশাসনের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল।
দেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও এদিন বিস্তারিত কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিএনপি অতীতেও বহুবার অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত একটি সত্য।
দেশের আপামর জনসাধারণের এই দলটির প্রতি এক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য টান রয়েছে বলেই তারা বারবার তাদের স্বতঃস্ফূর্ত ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া এই ঐতিহাসিক দলটি দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে, বিশেষ করে যখনই গণতন্ত্র ও মানবাধিকার হুমকির মুখে পড়েছে, তখনই তা পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে অগ্রণী ও আপসহীন ভূমিকা পালন করে এসেছে।
জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত বর্তমান সরকারও দেশের প্রতিটি স্তরে সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভারত সফরের পটভূমি নিয়ে বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরেই কূটনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনা চলছিল।
বিশেষ করে গত আগস্ট মাসে তার সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ব্যাপক খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত গত মাসে সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত সফরটি অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে এই সফরের বিষয়ে বারবার গভীর আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে এবং দুই দেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার ঢাকার পক্ষ থেকে সফরের বিষয়ে আগের চেয়ে তুলনামূলক অনেক বেশি ইতিবাচক ও সুনির্দিষ্ট বার্তা প্রদান করা হলো। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সূচি চূড়ান্ত হওয়ামাত্রই একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফরের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের রাজধানীতে পদার্পণ করবেন।
এদিকে আঞ্চলিক কূটনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সরকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। নতুন একটি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বনামধন্য উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের আরও বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কিনতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ।
গত রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর এই চুক্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন।
এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিমান পরিবহন সংস্থার সক্ষমতা আন্তর্জাতিক রুটে বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার এই সিদ্ধান্ত নিয়েও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবির সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার করেছেন।
তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে নয়, বরং সম্পূর্ণ নিজেদের রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনেই সরকার নতুন বোয়িং কেনার পথে অগ্রসর হচ্ছে।
মূলত ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আগামী দিনে বাংলাদেশকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান একটি আকাশপথের যোগাযোগ কেন্দ্র বা 'এভিয়েশন হাব' হিসেবে গড়ে তোলার যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তির এই উড়োজাহাজগুলো কেনা তারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সবসময় তার নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সম্পাদন করে থাকে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।