ভোট গণনার একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে প্রশান্ত কিশোর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীর চেয়ে প্রায় পনেরো হাজার আটশ চৌষট্টি ভোটের এক বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
এই বিপুল ব্যবধান কার্যত নিশ্চিত করে দিয়েছে যে, বাঁকিপুর আসনে বিজেপির তিন দশকের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের ঐতিহাসিক অবসান ঘটতে চলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে বিহারের রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে আখ্যায়িত করছে।
এই উপনির্বাচনের প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীন রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর গত এপ্রিল মাসে বাঁকিপুর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। এরপরই ভারতের নির্বাচন কমিশন এই আসনে উপনির্বাচনের আয়োজন করে।
বাঁকিপুর আসনটির অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি আক্ষরিক অর্থেই বিজেপির একটি অভেদ্য দুর্গ ছিল। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও নিতিন নবীন প্রায় একান্ন হাজার নয়শ ছত্রিশ ভোটের এক বিশাল ও অনতিক্রম্য ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন। তিনি ২০১০ সাল থেকে টানা এই আসনের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে আসছিলেন।
তার এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত ছিল। তার বাবা, প্রয়াত প্রবীণ রাজনীতিক নবীন কিশোর প্রসাদ সিনহা, ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পাটনা পশ্চিম আসনের বিধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পরবর্তীতে ২০০৮ সালে নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর পাটনা পশ্চিম আসনটির ভৌগোলিক কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান বাঁকিপুর আসন হিসেবে গঠিত হলে সেটিও বিজেপি অত্যন্ত সফলভাবে নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়।
জয়ের সুস্পষ্ট আভাস পাওয়ার পর জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর গণমাধ্যমের সামনে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী অথচ বিনয়ী সুরে তিনি বলেন যে, তারা ভবিষ্যতে কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট গঠন করবেন না।
তার দলের একমাত্র জোট হবে বিহারের আপামর সাধারণ মানুষের সঙ্গে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাঁকিপুরের সচেতন জনগণ প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গভীর আস্থা স্থাপন করেছেন।
প্রশান্ত কিশোর তার এই অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য কেবল নিজ দলের কর্মীদেরই নয়, দলমত নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এমন অনেক মানুষ আছেন যারা আনুষ্ঠানিকভাবে জন সুরাজ পার্টির সদস্য না হয়েও তাদের এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করেছেন।
তার মতে, এই পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থনকারীদের মধ্যে বিজেপি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং জাতীয় কংগ্রেসের মতো দলের অনেক সাধারণ সমর্থকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, যা এই জয়কে আরও বেশি সর্বজনীন করে তুলেছে।
এই উপনির্বাচনে একটি বিশেষ মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে স্থানীয় বিজেপি নেতাদের মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং অহংকার সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
প্রচারণার এক পর্যায়ে ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও প্রবীণ নেতা রবিশঙ্কর প্রসাদের নামে একটি মন্তব্য লোকমুখে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয়েছিল যে, বাঁকিপুরে বিজেপির রাজনৈতিক ভিত্তি এতটাই সুদৃঢ় যে, দলীয় মনোনয়নে যদি কোনো কুকুর বা বিড়ালকেও প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয়, তাহলেও সে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে।
যদিও পরবর্তীতে তিনি এমন কোনো অবমাননাকর মন্তব্য করার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন, তবুও ততক্ষণে এই মন্তব্যটি সাধারণ ভোটারদের আত্মসম্মানে আঘাত হেনেছিল এবং নির্বাচনী আবহে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল।
এদিকে ভোট গণনার দিন পাটনার রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর প্রাথমিক পর্যায়েই অতি-উৎসাহী বিজেপি কর্মীরা তাদের সম্ভাব্য বিজয় আগেভাগেই উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
তাদের আনন্দ-উল্লাসের অংশ হিসেবে প্রচুর পরিমাণে মিষ্টি ও লাড্ডু প্রস্তুত করার একাধিক ভিডিওচিত্র দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যখন ভোট গণনার সমীকরণ পাল্টাতে শুরু করে এবং প্রশান্ত কিশোর ক্রমশ জয়ের দিকে এগোতে থাকেন, তখন সেই দৃশ্যগুলো নিয়ে অন্তর্জাল ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্যাপক হাস্যরস ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একজন ব্যবহারকারী তীব্র কটাক্ষ করে মন্তব্য করেন যে, ওই প্রস্তুতকৃত লাড্ডুগুলো অবিলম্বে প্রশান্ত কিশোরের দলীয় কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। আরেকজন কৌতূহল প্রকাশ করে লেখেন, নির্বাচনের আগে আগাম বিজয়ের মিথ্যে আশায় যে বিপুল পরিমাণ লাড্ডু বানানো হয়, প্রার্থী হেরে গেলে সেগুলোর পরিণতি কী হয়?
সেগুলো কি সাধারণ মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়, দাতব্য কাজে দান করা হয়, নাকি নষ্ট করা হয়? দ্য হিন্দু পত্রিকার সূত্র অবলম্বনে প্রাপ্ত এই সংবাদটি প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের রায়ই চূড়ান্ত এবং মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যেকোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির পতনের কারণ হতে পারে।