অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হওয়া প্রজননক্ষম ও আশাবাদী তরুণ প্রজন্মের ওপর পুলিশের এই তাণ্ডব পুরো রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও মানবাধিকার উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনের সপ্তদশ দিনে এসে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যকার সংঘাত চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাজার হাজার বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী রাজ্য বিধানসভা ভবনের উদ্দেশ্যে শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে রওনা হন।
মিছিলটি রাজধানী রাঁচির জগন্নাথপুর মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ তাঁদের পথরোধ করতে সুবিশাল ব্যারিকেড গড়ে তোলে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা পুলিশের তৈরি সেই নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কোনো রূপ পূর্বসতর্কতা ছাড়াই লাঠিচার্জ শুরু করে এবং নির্বিচারে টিয়ারগ্যাস ও উচ্চমাত্রার জলকামান ব্যবহার করে। এতে বহু তরুণ আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন এবং পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আহত একাধিক শিক্ষার্থীকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।
ঝাড়খণ্ড রাজ্যের এই নজিরবিহীন অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের কেলেঙ্কারি।
আন্দোলনকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের মাধ্যমে অযোগ্যদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং যোগ্য প্রার্থীদের প্রতারিত করা হচ্ছে। তাঁরা অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত অন্তত ১৩টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা অবিলম্বে সম্পূর্ণ বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন।
এর পাশাপাশি তাঁরা সরকারি কমিশন দুটির প্রশাসনিক কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কার এবং পুরো প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরপেক্ষতা বজায় রেখে তদন্তের জন্য কেলেঙ্কারির সিবিআই তদন্ত কিংবা অন্য কোনো রাজ্যের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি তুলেছেন।
সরকারের সঙ্গে ইতিপূর্বে একাধিক দফায় অনুষ্ঠিত বৈঠক কোনো সমাধান আনতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষুব্ধ তরুণেরা এই কঠোর রাজপথের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন।
এদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের মূলধারার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ উত্থাপন করে বলছেন যে, নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকা দিতে এবং ন্যায়সংগত গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে রাজ্য সরকার পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভয়ভীতি ও সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে।
তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন রাজ্যের দায়িত্বশীল মন্ত্রী সুদিব্য কুমার। তিনি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে দাবি করেন যে, আন্দোলনকারীদের সিংহভাগ যুক্তিসংগত দাবি সরকার ইতিমধ্যেই আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করে মেনে নিয়েছে।
তাঁর মতে, মূল দাবিগুলো মেনে নেওয়ার পরও একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী, বিশেষ করে বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি নিজেদের সংকীর্ণ ফায়দা হাসিল করার লক্ষ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সরল আবেগ ও আন্দোলনকে উসকানি দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে।
ভারতের প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থায় যুবসমাজের সরকারি চাকরির প্রতি গভীর আস্থা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূরীকরণের প্রত্যাশা জড়িত। শিক্ষাবিদদের মতে, নিয়োগ পরীক্ষার এই অনিয়ম লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎকে ঘোর অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, যা চরম সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যেকোনো স্বাধীন দেশে নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ উপায়ে সভা-সমাবেশ ও প্রতিবাদের সুনির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের ন্যায্য প্রতিবাদের ওপর প্রশাসনিক দমনপীড়ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকার চর্চার পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের অভিমত হলো, কেবল লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়; বরং অবিলম্বে সব পক্ষের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে নিয়োগ ব্যবস্থার পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে তরুণদের মধ্যে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনাই রাজ্য সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।