শনিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫
২৯ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে গণভোট ‘অবাস্তব ও অপ্রয়োজনীয়’- মির্জা ফখরুল

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৫, ০২:২৪ পিএম

জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে গণভোট ‘অবাস্তব ও অপ্রয়োজনীয়’- মির্জা ফখরুল
ছবি: Collected

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে পৃথকভাবে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাবকে ‘অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক এবং অবাস্তব’ বলে কঠোরভাবে নির্ঘণ্ট করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমা যখন প্রায় নির্ধারিত, তখন তার মাত্র কয়েক মাস আগে দেশব্যাপী আরেকটি বিশাল কর্মযজ্ঞ আয়োজনকে সময়, অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অপচয় হিসেবে দেখছে দলটি।

 

বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানী ঢাকার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে দলের এই আনুষ্ঠানিক অবস্থান তুলে ধরেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, "বিএনপি নির্বাচনের দিন ব্যতীত অন্য কোনো দিনে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব কখনোই মেনে নেবে না। একটি গণভোট আয়োজনের জন্য যে বিপুল সময়, রাষ্ট্রীয় খরচ এবং জাতীয় নির্বাচনের মতোই ব্যাপক লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন, তা বিবেচনায় এই প্রস্তাবটি একটি অপরিণামদর্শী নার ফসল।" অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে যখন দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে 'জাতীয় ঐকমত্য কমিশন'-এর পক্ষ থেকে আসা এই সুপারিশ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব কেবল গণভোটের সময়সূচি নিয়েই আপত্তি জানাননি, বরং 'জাতীয় ঐকমত্য কমিশন'-এর সামগ্রিক সুপারিশমালার বিষয়ে দলের ‘গভীর হতাশা’ ব্যক্ত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এই সুপারিশগুলো প্রণয়নের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং দলগুলোর মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বিভক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

 

মির্জা ফখরুল বলেন, "আমরা কমিশনের অন্যান্য সুপারিশগুলোর সাথেও একমত হতে পারছি না। এর প্রধান কারণ হলো, দীর্ঘ আলোচনায় যেসব বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট ভিন্নমত বা 'নোট অব ডিসেন্ট' ছিল, সেগুলোকে চূড়ান্ত সুপারিশে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে। তদুপরি, এমন অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা দীর্ঘ বৈঠকগুলোতে কখনোই আলোচনায় আসেনি।"

 

এই অভিযোগের মাধ্যমে বিএনপি স্পষ্টতই ঐকমত্য কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দলের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, এই ধরনের 'স্বেচ্ছাচারী সংস্কার' প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে তা জাতীয় স্বার্থে 'দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির' কারণ হতে পারে।

 

মূলত, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার। এই সংস্কারের রূপরেখা হিসেবেই রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত 'জাতীয় ঐকমত্য কমিশন' দীর্ঘ আলোচনার পর 'জুলাই জাতীয় সনদ' প্রণয়ন করে, যাতে বিএনপি সহ অধিকাংশ দল স্বাক্ষর করে।

 

সেই জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সাংবিধানিক ও কাঠামোগত সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই একটি গণভোট আয়োজনের বিষয়ে দলগুলো নীতিগতভাবে একমত হয়েছিল। মির্জা ফখরুল সেই প্রসঙ্গের অবতারণা করে বলেন, "আমরা শুধুমাত্র জুলাই সনদের বাস্তবায়নকে একটি আইনি ভিত্তি দেওয়ার প্রয়োজনেই গণভোটে সম্মত হয়েছিলাম।" বিএনপির এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট যে, দলটি গণভোটের ধারণার বিরোধী নয়, বরং এর সময়কাল এবং কমিশনের সুপারিশকৃত পদ্ধতি নিয়েই তাদের মূল আপত্তি।

 

বিএনপি মহাসচিব কেবল সমালোচনাই নয়, এই অচলাবস্থা নিরসনে একটি বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক বিকল্প প্রস্তাবও সরকারের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি রাষ্ট্রীয় অর্থ সাশ্রয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মির্জা ফখরুল বলেন, "বিদ্যমান সীমিত সময়, বিপুল পরিমাণ খরচ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের সহ প্রয়োজনীয় ব্যাপক জনবলের কথা বিবেচনা করে, গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন একই দিনে একযোগে আয়োজন করাই হবে সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।"

 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির এই প্রস্তাবের পেছনে দুটি প্রধান যুক্তি কাজ করছে। প্রথমত, পৃথকভাবে দুটি জাতীয় পর্যায়ের আয়োজন দেশের প্রশাসনিক কাঠামো এবং অর্থনীতির ওপর চাপ ফেলবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট আয়োজন করা হলে তা ভোটারদের অংশগ্রহণকেও সহজতর করবে। 'জুলাই সনদ' স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কারের প্রশ্নে যে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল, ঐকমত্য কমিশনের সাম্প্রতিক সুপারিশ সেই ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে বলে মনে করছেন মির্জা ফখরুল।

 

তিনি সতর্ক করে বলেন, "এ ধরনের প্রস্তাব (নির্বাচনের আগে গণভোট) জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বিভক্ত করবে।" তাঁর এই আশঙ্কা অমূলক নয়। ইতোমধ্যে কমিশনের এই সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ দৃশ্যমান হয়েছে। কয়েকটি দল কমিশনের প্রস্তাবকে সমর্থন করলেও বিএনপি এবং আরও কিছু দল এর তীব্র বিরোধিতা করছে। এই বিভাজন আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এই একতরফা সুপারিশ বাস্তবায়নের পথে না হেঁটে, পুনরায় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি সর্বজনীন ও বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো সংস্কার অবশ্যই জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে হতে হবে, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর বা কমিশনের 'স্বেচ্ছাচারী' সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়।

 

সব মিলিয়ে, গণভোটের সময়সূচি নিয়ে সৃষ্ট এই নতুন বিতর্ক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে এই জটিলতার নিরসন কীভাবে হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ।