শুক্রবার, জুন ২৬, ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে প্রাণহানি বেড়ে ১৬৪

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে প্রাণহানি বেড়ে ১৬৪
ছবি : Collected

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে এবং সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সময় গত বুধবার সন্ধ্যায় কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে পরপর দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূকম্পন সমগ্র দেশটিকে কাঁপিয়ে দেয়।

 

আকস্মিক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শতশত আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেক মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার ফলে উদ্ধার অভিযান যতই অগ্রসর হচ্ছে, হতাহতের সংখ্যা ততটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এই ভূমিকম্পের পরপরই একটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছিল। সংস্থাটির প্রাথমিক গাণিতিক মডেল ও ক্ষয়ক্ষতির রূপরেখা বিশ্লেষণ করে জানানো হয়েছিল যে, এই ভয়াবহ দুর্যোগের কারণে নিহতের সংখ্যা চূড়ান্ত পর্যায়ে হয়তো এক লাখ পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে।

 

তবে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সর্বশেষ যে দাপ্তরিক তথ্য প্রকাশ করেছেন, তাতে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ১৬৪ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানান যে, এই জোড়া ভূকম্পনের আঘাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৯৭১ জন নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে জরুরি শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং চিকিৎসকেরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই জোড়া ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটের দিকে ভেনেজুয়েলাজুড়ে প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২। এই প্রথম ঝাঁকুনির ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই, মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে দ্বিতীয় আরেকটি ভয়াবহ কম্পন আঘাত হানে, যার মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫।

 

কোমলতা বা কম্পনের এই তীব্রতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা তাদের বিশেষ বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, অত্যন্ত কম সময়ের ব্যবধানে দুটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার কারণেই মূলত ভবনগুলোর কাঠামোগত ভিত্তি ভেঙে পড়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

 

এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উদ্ধারকাজ দ্রুত গতিতে পরিচালনার স্বার্থে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন।

 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের পক্ষ থেকে যাচাই ও ভৌগোলিক অবস্থান নিশ্চিত করা একাধিক ভিডিও চিত্রে ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন অঞ্চলের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। রাজধানী কারাকাসের বহুতল ভবন থেকে শুরু করে দেশের অন্যতম প্রধান উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মার-এর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো এই দুর্যোগে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

বিশেষ করে কাতিয়া লা মার একটি পাহাড়ি ঢালে অবস্থিত বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন চোখের পলকে ধসে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার দৃশ্য বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, তীব্র কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত বাসিন্দারা নিজেদের জীবন বাঁচাতে তাদের প্রিয়জন, শিশু এবং গৃহপালিত প্রাণীদের সঙ্গে নিয়ে বহুতল ভবনগুলো থেকে দ্রুত ফাঁকা রাস্তায় বেরিয়ে আসছেন।

 

চারদিকের হাহাকার এবং স্বজনদের খোঁজে মানুষের আর্তনাদ দুর্গত এলাকার বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। ভূমিকম্পের মূল ধাক্কাটি কেটে গেলেও ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের মন থেকে আতঙ্ক এখনো দূর হয়নি।

 

মূল কম্পনের পর বারবার ফিরে আসা মৃদু ও মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প-পরবর্তী কম্পন বা আফটারশকের ভয়ে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের অধিকাংশ শহরের বাসিন্দারা পুরো রাত খোলা আকাশের নিচে কাটিয়েছেন।

 

বহুতল ভবনগুলো পুনরায় ধসে পড়ার তীব্র আশঙ্কায় কেউ ঘরে ফিরে যাওয়ার সাহস পাননি। তীব্র আতঙ্ক ও খোলা পরিবেশের মধ্যেই শিশু এবং বৃদ্ধদের নিয়ে পার্ক, খেলার মাঠ ও প্রধান সড়কগুলোতে অবস্থান করছেন হাজারো পরিবার।

 

স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি দেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজে পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করেছেন। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধসে পড়া কংক্রিটের স্তূপ সরানোর কাজ চলছে, যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা প্রাণগুলোকে দ্রুত জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবিক সহায়তা সংস্থাও ভেনেজুয়েলার এই চরম বিপদের মুহূর্তে জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে পাশে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে।

 

- এএফপি