মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপ থেকে মা ও নবজাতকের অবিশ্বাস্য বেঁচে ফেরার গল্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম

ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপ থেকে মা ও নবজাতকের অবিশ্বাস্য বেঁচে ফেরার গল্প
ছবি: Collected

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের পর যখন চারদিকে কেবলই মৃত্যু আর ধ্বংসের বিষাদ, ঠিক তখনই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক অবিশ্বাস্য বেঁচে ফেরার গল্প পুরো বিশ্বকে নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে।

 

দেশটির ধসে পড়া একটি বহুতল ভবনের কংক্রিটের নিচ থেকে ১৮ দিন বয়সী এক নবজাতক সন্তানসহ এক মাকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে এই মা কীভাবে কেবল তার কোলের শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকার প্রবল সাহস জুগিয়েছেন, সেই শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতার কথা তিনি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির কাছে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বর্ণনা করেছেন।

 

গত বুধবার ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী জোড়া ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং পুরো দেশ কার্যত এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট এই দুর্যোগকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে এখনও অন্তত পঞ্চাশ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা দিনরাত কাজ করে গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত মানুষ উদ্ধারের আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

 

তবে এর মাঝেই মা ও শিশুর এই অভাবনীয় উদ্ধারের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং এই চরম বিপর্যয়ের মাঝে শিশু হুয়ান ডেভিড পরিণত হয় এক নতুন আশার প্রতীকে।

 

গত রোববার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে শুয়ে বিবিসিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে সেই ভয়াল মুহূর্তের কথা স্মরণ করেন ওই সাহসী নারী দায়ানা পাতিনো। তিনি জানান, দেশের উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলের লা গুয়াইরায় নিজেদের আট তলার ভবনের রান্নাঘরে যখন তিনি থালাবাসন পরিষ্কার করছিলেন, ঠিক তখনই প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয়।

 

এটিকে মৃদু কম্পন ভেবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে গিয়ে নিজের শিশু সন্তান হুয়ান ডেভিডকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে দায়ানা বলেন, মুহূর্তের মধ্যেই তার মনে হলো যেন তিনি বাতাসে উড়ছেন এবং এরপরই গভীর কাদাপানির নিচে তলিয়ে গিয়ে এক অন্ধকার গহ্বরে আছড়ে পড়েন।

 

আট তলা থেকে নিচে পড়ার পরও কীভাবে তিনি সন্তানকে নিজের কোল থেকে হাতছাড়া হতে দেননি, তা আজও তার কাছে এক পরম বিস্ময়। ধসে পড়া ভারী আসবাবপত্রের নিচে দায়ানা এমনভাবে চাপা পড়েছিলেন যে তার নড়াচড়া করার কোনো উপায় ছিল না।

 

তার বাম পা কংক্রিটের বিশাল খণ্ডের নিচে আটকা পড়েছিল এবং কপাল একটি শক্ত পাথরের সঙ্গে চেপে ছিল। এই অন্ধকারে আটকে পড়ার পর বাঁচার আকুতিতে তিনি প্রথমে তীব্র চিৎকার শুরু করেন, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই উপলব্ধি করেন যে এই গহ্বরের গভীরে তার কণ্ঠস্বর শোনার মতো কেউ নেই।

 

তখন তিনি নিজের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে স্থির করেন যে, অযথা চিৎকার করে তিনি শারীরিক শক্তি ক্ষয় করবেন না। সিদ্ধান্ত নেন, যখন বাইরে থেকে কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর বা পায়ের আওয়াজ শুনতে পাবেন, ঠিক তখনই সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সাহায্য চাইবেন।

 

তিনি জানান, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যেও তিনি ওপরের দিকে চাঁদের মতো একটি ছোট্ট আলোর বিন্দু দেখতে পাচ্ছিলেন। ওই মুহূর্তে পিঠের নিচে একটি ধর্মীয় গ্রন্থ বা বাইবেলের উপস্থিতি অনুভব করার পর তিনি যেন নতুন করে বেঁচে ফেরার এক আলো দেখতে পান এবং সেখান থেকেই শুরু হয় মৃত্যুর সঙ্গে তার লড়াই।

 

দায়ানা জানান, সেই অন্ধকার গর্তে তার আঠারো দিন বয়সী ছোট্ট ছেলে হুয়ান ডেভিডই তাকে জেগে থাকার এবং সচেতন থাকার অন্তহীন মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল। তিনি বলেন, যতক্ষণ ওই অবুঝ শিশুটি বেঁচে ছিল, তিনিও বেঁচে থাকার লড়াই অবিরাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

 

শিশুটি তখনও শ্বাস নিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে অন্ধকারের মধ্যেই তিনি বারবার তার ছোট্ট নাকে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতেন এবং স্রষ্টার কাছে উদ্ধারের জন্য নিরন্তর প্রার্থনা করতেন। দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর শেষে গত বৃহস্পতিবার তিনি হঠাৎ ওপর থেকে তার ভাইয়ের পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পান।

 

নিজের নাম ধরে ডাকার আওয়াজ শুনে তিনি তার ফুসফুসের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে জানান দেন যে তিনি সেখানে বেঁচে আছেন। ভাই তাকে কথা দেন, তাকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে এক পা-ও নড়বেন না।

 

অবশেষে বৃহস্পতিবার রাতে এক সতর্ক ও জটিল উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে মা ও শিশুকে সেই বিভীষিকা থেকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনা হয়। ভূমিকম্পের সময় দায়ানার স্বামী গারসন বাড়ি ফিরে সবেমাত্র গাড়ি রাখছিলেন এবং কোনোমতে সীমানা প্রাচীর টপকে নিজের জীবন রক্ষা করেন।

 

চোখের সামনে নিজের সাজানো সংসার ধূলিসাৎ হতে দেখে তিনি সবচেয়ে খারাপ কিছুরই আশঙ্কা করেছিলেন। তাই স্ত্রী ও সন্তানকে জীবিত ফিরে পাওয়ার মুহূর্তটিকে তিনি নিজের পুনর্জন্ম হিসেবে অভিহিত করেন।

 

আবেগে আপ্লুত গারসন বিবিসিকে জানান, তিনি ভেবেছিলেন তারা আর বেঁচে নেই, কিন্তু তাদের অক্ষত দেখে তার মনে হয়েছে যেন মৃত শরীরে প্রাণ ফিরে এসেছে। ভয়ংকর এই ভূমিকম্পে গারসন ও দায়ানা দম্পতির সাজানো সংসার ও সব মূল্যবান জিনিসপত্র আক্ষরিক অর্থেই ধুলোয় মিশে গেছে।

 

পরিবারের প্রিয় পোষা কুকুরটিও এই দুর্যোগের পর থেকে নিখোঁজ থাকায় তারা গভীরভাবে শোকাহত। তবে এত বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পরও এই দম্পতি চরম হতাশায় নিমজ্জিত হননি, বরং শূন্য থেকে আবারও নতুন করে জীবন শুরু করার এক দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

 

গারসন আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন, তারা হয়তো জাগতিক সবকিছু হারিয়েছেন, কিন্তু এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও যে সপরিবারে বেঁচে আছেন, এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। হারানো সবকিছু আবারও নতুন করে গড়ে তোলার অদম্য সাহস নিয়ে তারা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান।

 

- বিবিসি