আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, নতুন এই নীতিমালার আওতায় বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা বছরে একাধিকবার সৌদি আরবে প্রবেশ করার অভূতপূর্ব সুযোগ পাবেন।
তবে এই দীর্ঘ মেয়াদের ভিসার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্তারোপ করেছে দেশটির হজ ও ওমরাহ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিবার সৌদি আরবে প্রবেশের পর দর্শনার্থীরা একনাগাড়ে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবেন।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘সৌদি প্রেস এজেন্সি’ (এসপিএ) সোমবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। সৌদি আরবের এই নতুন ওমরাহ ভিসা প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে দেশটির যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, যা বিশ্বজুড়ে ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’ নামে পরিচিত।
এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরবের অর্থনীতিকে কেবলমাত্র জ্বালানি তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বের করে এনে পর্যটন, সেবা ও বিনোদনসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতগুলোর ব্যাপক প্রসার ঘটানো।
ওমরাহ ভিসার মেয়াদ এক বছরে উন্নীত করার এই পদক্ষেপটি সেই মহাপরিকল্পনারই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অংশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বব্যাপী ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরী দর্শন এবং ওমরাহ পালনের প্রক্রিয়াটি আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সাশ্রয়ী হবে, যা একই সঙ্গে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধি করবে।
নতুন এই নিয়মাবলীর সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য সৌদি সরকার তাদের আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অনলাইন সেবার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। নতুন ভিসানীতি অনুযায়ী, ওমরাহ পালনে ইচ্ছুক যেকোনো দর্শনার্থীকে প্রতিবার সৌদি আরবে আগমনের পূর্বে দেশটির সরকারের বিশেষ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘নুসুক’ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে একটি ওমরাহ প্যাকেজ ক্রয় করতে হবে।
এই প্যাকেজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, নির্বাচিত প্যাকেজের সময়কাল কোনোভাবেই আবেদনকারীর ওমরাহ ভিসার অবশিষ্ট মেয়াদের চেয়ে বেশি হতে পারবে না। অর্থাৎ, ভিসার মেয়াদ যতদিন বাকি থাকবে, প্যাকেজের সময়সীমাও তার ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
এর পাশাপাশি, সৌদি আরবের মাটিতে পা রাখার আগেই প্রত্যেক দর্শনার্থীকে এই ‘নুসুক’ অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাদের ওমরাহ পালনের সুনির্দিষ্ট অনুমতিপত্র বা পারমিট সংগ্রহ করতে হবে, যা বিমানবন্দর ও পবিত্র স্থানগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ হজের সময় পবিত্র নগরীগুলোতে আগত বিপুল সংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই নতুন ভিসার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা নিষ্ক্রিয়তার সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পবিত্র হজ মৌসুমের সময় এই ওমরাহ ভিসাটি সম্পূর্ণ সাময়িকভাবে কার্যকর থাকবে না।
অর্থাৎ, ইসলামি চন্দ্র বর্ষপঞ্জি বা হিজরি সনের জিলক্বদ মাসের ১ তারিখ থেকে শুরু করে পরবর্তী জিলহজ মাসের ১৩ তারিখ পর্যন্ত এই বিশেষ ওমরাহ ভিসাটি ব্যবহার করে কোনো দর্শনার্থী সৌদি আরবে প্রবেশ করতে পারবেন না।
এই নির্দিষ্ট সময়টিতে বিশ্বজুড়ে কেবল হজের উদ্দেশ্যে অনুমোদিত ব্যক্তিরাই সৌদি আরবে অবস্থানের সুযোগ পান। হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর এবং এই নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পরেই কেবল ওমরাহ ভিসাধারীরা পুনরায় এই ভিসার সুবিধা ব্যবহার করে দেশটিতে যাতায়াত করতে পারবেন।
আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বিমান চলাচল খাতের বিশেষজ্ঞরা সৌদি আরবের এই নতুন পদক্ষেপকে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, ওমরাহ ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং বছরে একাধিকবার প্রবেশের এই সুযোগ বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি সৌদি আরবের পর্যটন খাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। পূর্বে ওমরাহ ভিসার মেয়াদ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত থাকায় দর্শনার্থীদের নানাবিধ প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হতো এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের ভ্রমণ শেষ করতে হতো।
এখন নতুন নিয়মের ফলে দর্শনার্থীরা পবিত্র ওমরাহ পালনের পাশাপাশি সৌদি আরবের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও আধুনিক পর্যটন কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ পাবেন। এটি সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন শিল্পে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে এবং ‘ভিশন ২০৩০’ এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সৌদি আরবকে অনেক দূর এগিয়ে দেবে।