হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিলটিতে নিজের সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বিলটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়েছে এবং আগামী ত্রিশ দিনের মধ্যেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
নতুন এই আইনের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার ফলে বিশেষ করে ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এই বিলটির মূল উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার অর্থনীতি ও যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রুশ সামরিক বাহিনী প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইউক্রেনে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়।
সেই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিশেষ করে রাশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তাদের জ্বালানি তেল রপ্তানির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের এই কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারের অনেক দেশ নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা মেটাতে তুলনামূলক কম মূল্যে রাশিয়ার কাছ থেকে নিয়মিতভাবে বিপুল পরিমাণ তেল ক্রয় অব্যাহত রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যেসব দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল আমদানি করছে, তারা পরোক্ষভাবে রাশিয়ার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে এবং এর ফলে ইউক্রেনের বুকে চলমান এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আরও দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, রাশিয়ার কাছ থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণে তেল ক্রয়কারী শীর্ষ পাঁচটি দেশের ওপর ওয়াশিংটন চাইলে সর্বোচ্চ একশো শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলোর লাগাতার নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর বহু দেশ মস্কোর কাছ থেকে জ্বালানি তেল ক্রয় করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে থাকা দশটি দেশের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
এই তালিকার উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, হাঙ্গেরি, আজারবাইজান, তুরস্ক, স্লোভাকিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, কাজাখস্তান এবং কিরগিজস্তানের মতো রাষ্ট্র। তবে এই আইনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত দিকটি হলো, ‘রুশ তেলের শীর্ষ আমদানিকারক পাঁচ দেশ’ হিসেবে শাস্তির কথা উল্লেখ থাকলেও, আইনে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো একক দেশের নাম সরাসরি লিপিবদ্ধ করা হয়নি।
এর সহজ অর্থ হলো, রাশিয়ার তেল আমদানি করার অভিযোগে ঠিক কোন কোন দেশের ওপর এই একশো শতাংশ বিপুল পরিমাণ শুল্ক আরোপ করা হবে, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা এবং একচ্ছত্র ক্ষমতা মার্কিন প্রশাসনের হাতেই সংরক্ষিত থাকছে।
আইনের এই কৌশলগত অস্পষ্টতার কারণেই ভারতের মতো বৃহৎ ক্রেতা দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। আইনটি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে ভারতের রপ্তানি পণ্য একশো শতাংশ শুল্কের মুখে পড়বে, তা এখনই শতভাগ নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই।
কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত রুশ তেলের অন্যতম প্রধান বড় ক্রেতা হলেও, ওয়াশিংটন চাইলে নিজেদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত কারণে ভারতকে ‘রাশিয়ার তেলের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশ’-এর তালিকা থেকে বাইরে রাখতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের কাছে সেই নমনীয়তা প্রদর্শনের আইনি সুযোগ রয়ে গেছে।
তবে এত কিছুর পরও এই বিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর ভারতের নীতিনির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি বার্তা বহন করছে। কারণ এই নতুন আইনের ছায়াতলে ওয়াশিংটন চাইলে যেকোনো ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির মুহূর্তে বা যেকোনো সময় ভারতের ওপর একশো শতাংশ রপ্তানি শুল্ক জারির খড়গ নামিয়ে আনতে পারবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন ‘রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা আইন’ বিলটির মূল প্রস্তাবক বা প্রণেতা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটের প্রভাবশালী সদস্য লিন্ডসে গ্রাহাম। তিনি একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র এবং ইউক্রেনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনের একজন কট্টর প্রবক্তা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।
রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ৭ আগস্ট তারিখে এই বিলটি মার্কিন সিনেটে আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়। তবে বিলটি পাস হওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায় গত ১১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন প্রবীণ এই সিনেটর।
তার মৃত্যুর পর গত ১৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদেও বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়ে যায় এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রেসিডেন্টের দপ্তরে পাঠানো হয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিলে স্বাক্ষর করার ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত কড়া ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে ওই বিবৃতিতে ভারত সরকার জানিয়েছে যে, ভারত এর আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান ও বৈশ্বিক ফোরামে বহুবার স্পষ্টভাবে বলেছে এবং আজ আবারও অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, নয়াদিল্লি ভারতের ১৪০ কোটি বিশাল জনসংখ্যার জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কোনো অবস্থাতেই আপস করতে প্রস্তুত নয়।
ভারত বরাবরই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি ক্রয় করে আসছে এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ভবিষ্যতেও তাদের এই নীতি অব্যাহত থাকবে। নিজেদের জাতীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে ভারত সরকার সবসময়ই দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
ভারত আরও মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন আইন যদি আক্ষরিক অর্থে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা শুধু ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সম্পর্কেই চিড় ধরাবে না, বরং এটি পুরো বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অত্যন্ত নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলবে।