সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত ৪৬তম ‘কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক পবিত্র কোরআন প্রতিযোগিতা’-এ অভাবনীয় সাফল্য অর্জনকারী বাংলাদেশের হাফেজদের সম্মানে আয়োজিত এক বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এই যুগান্তকারী ঘোষণা দেন।
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ সচিবালয়ে অবস্থিত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশ্বজয়ী হাফেজদের আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে তাদের এই অসাধারণ সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশের সকল মানুষের, বিশেষ করে মুসলমানদের জন্য এক অনন্য গৌরবের বিষয়।
দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হাফেজদের এমন সম্মাননা জানানোর বিষয়ে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাদের অনুভূতির কথা জানান। এই প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করেন যে, দেশের সন্তানরা যারা আমাদের ভবিষ্যৎ, তারা নিজেদের মেধা, শ্রম ও যোগ্যতা দিয়ে যেকোনো ক্ষেত্রে যা কিছুই ভালো অর্জন করবে, রাষ্ট্রের অবস্থান থেকে তার যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদান করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নীতিগত সিদ্ধান্ত।
মেধাবীদের উৎসাহিত করার দীর্ঘমেয়াদি সুফলের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যোগ্যদের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারলে এবং তাদের অনুপ্রেরণা জোগালে তার ইতিবাচক প্রভাব সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নিশ্চিতভাবেই পড়বে।
এর ফলে শেষ পর্যন্ত সার্বিকভাবে দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই সমাজের প্রতিটি স্তরে মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এরই অংশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বিজয়ী এই মেধাবী হাফেজদের রাষ্ট্রীয়ভাবে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে আগত বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষকরা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক, শিক্ষাগত ও কাঠামোগত কিছু সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রীর সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
অত্যন্ত মনোযোগ ও সহানুভূতির সঙ্গে তাদের কথা শোনার পর তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে আলোচনা করে সাধ্যমতো কার্যকর সমাধানের পথ খোঁজার জোরালো আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো সমাধানের কোনো যৌক্তিক পথ সরকারের কাছে থাকলে, তা অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দেখা হবে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের সম্মানজনক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সার্বিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, দেশের তরুণ-তরুণীরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও বেশি করে অংশগ্রহণ করুক এবং নিজেদের ও দেশের মানুষের জন্য সম্মান বয়ে আনুক, সরকার সেটাই গভীরভাবে প্রত্যাশা করে।
এ লক্ষ্যে নিয়মমাফিক যেকোনো ধরনের সরকারি সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা পূরণে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন। শুধু নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী নয়, বরং দেশে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে একযোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, সবার কাজের ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পূর্ণ অভিন্ন। আর তা হলো একটি সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ, যেখানে প্রতিটি মানুষ মর্যাদার সঙ্গে তাদের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। দেশ ও সাধারণ জনগণের কল্যাণে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি সবার আন্তরিক সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী পরম মমতায় নিজ হাতে বিজয়ী হাফেজদের শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে বই তুলে দেন। এর আগে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যে সুরাগুলো তিলাওয়াত করে তারা বিশ্বমঞ্চে ঐতিহাসিক পুরস্কার ছিনিয়ে এনেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুরোধে তারা নিজ কণ্ঠে সেই সুরাগুলোর সুমধুর তিলাওয়াত করে উপস্থিত সবাইকে শোনান।
উল্লেখ্য, গত আগস্ট মাসে সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১৩৩টি দেশের প্রতিযোগীদের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলে ১৫ পারা হিফজ, তাজবিদ ও সুন্দর তিলাওয়াত বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন বাংলাদেশের কৃতি সন্তান হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া।
একই সঙ্গে ৩০ পারা হিফজ, তাজবিদ ও সুন্দর তিলাওয়াত বিভাগে তৃতীয় স্থান লাভ করেন হাফেজ শেখ মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান আশরাফী। নারী শাখায় ১৫ পারা বিভাগে হাফেজা রাবেতা বিনতে রমজান এবং ৩০ পারা বিভাগে হাফেজা মুসফিরা বিনতে মাহমুদ তৃতীয় স্থান অর্জন করে দেশের জন্য অভাবনীয় গৌরব বয়ে আনেন।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আয়োজিত এই আনন্দঘন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার।