শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শর্ত সাপেক্ষে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার প্রস্তাব ইরানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম

শর্ত সাপেক্ষে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার প্রস্তাব ইরানের
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও উত্তেজনাপূর্ণ সামরিক সংঘাত বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব দিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। নতুন এই কূটনৈতিক উদ্যোগের আওতায়, কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আগামী সাত দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছে তেহরান।

 

বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সেখানে বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর বিষয়ে নিজেদের এই নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রস্তাবের কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেন।

 

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই নৌপথ খুলে দেওয়ার প্রস্তাবটি এমন এক সময়ে এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস এবং ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানসহ একাধিক শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের দেওয়া নির্দিষ্ট কিছু শর্ত যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মেনে নেয়, তবে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।

 

একই সঙ্গে এই শর্তগুলো পূরণ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঝুলে থাকা দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনাও পুনরায় শুরু করার ব্যাপারে তেহরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি জানান। এই প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে মূলত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরান, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতির জন্য একটি বড় খবর।

 

ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া এই প্রস্তাবের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে, যা নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। ইরানের নতুন এই প্রস্তাবে শুধু হরমুজ প্রণালীর সমাধানই চাওয়া হয়নি, বরং লেবাননসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আগামী সাত দিনের জন্য সব ধরনের সামরিক সংঘাত ও আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিও তেহরানের প্রস্তাবে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।

 

দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংকে অবরুদ্ধ করে রাখা ইরানের অন্তত এক হাজার দুইশ কোটি বা ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল সম্পদ অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত অবস্থা থেকে মুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।

 

এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেল বিক্রির ওপর থেকে সব ধরনের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে নৌ-অবরোধ জারি রেখেছে, তা অবিলম্বে তুলে নেওয়ার সুস্পষ্ট শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

 

এই সব শর্ত মেনে নিয়ে একটি সমন্বিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে, তার সপ্তম দিনে ইরান নিজস্ব উদ্যোগে হরমুজ প্রণালী পুনরায় সব ধরনের বাণিজ্যিক ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী করে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং এটি বাস্তবায়নের জন্য তারা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছেন। ওয়াশিংটনের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলেই এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ কার্যকর করা সম্ভব হবে।

 

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরানের এই শান্তি প্রস্তাবের প্রতি বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীনের পূর্ণ ও অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে, যা এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে আরও বেশি ওজনদার করে তুলেছে।

 

চীনের এই সমর্থনের বিষয়টি বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চলতি সপ্তাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।

 

ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের নির্ধারিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পাশাপাশি ইরানের এই প্রস্তাব এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে। বেইজিংয়ের সমর্থন থাকায় তেহরান কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ পাচ্ছে।

 

এর আগে, গত মঙ্গলবার ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জাপানের বিখ্যাত বার্তাসংস্থা কিয়োদো সর্বপ্রথম এই প্রস্তাবের খবর বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করেছিল। তবে সেই সময়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম কিয়োদোর ওই প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে খবর প্রকাশ করে, যা কিছুটা ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছিল।

 

অন্যদিকে, সে সময় তেহরানের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান বা ব্যাখ্যা স্পষ্ট করা হয়নি। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সরাসরি বক্তব্যের পর সেই ধোঁয়াশা পুরোপুরি কেটে গেছে এবং প্রস্তাবের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফের সঙ্গে নিউইয়র্কে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি। এই বৈঠকের বিস্তারিত সব তথ্য প্রকাশ্যে না এলেও, এর আগেও চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরানের পক্ষ থেকে সাতটি সুনির্দিষ্ট শর্ত দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বেশ আলোচিত ছিল।

 

ধারণা করা হচ্ছে, ওই বৈঠকেই প্রস্তাবের খুঁটিনাটি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনের এই প্রস্তাবে ইয়েমেনের প্রসঙ্গটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান এবং প্রভাবশালী শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেন মোহেবি গত মঙ্গলবার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইয়েমেনে চলমান দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের সম্পূর্ণ অবসান ঘটানোও তেহরানের অন্যতম প্রধান একটি দাবি।

 

সৌদি আরব ও তার মিত্রদের সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে, তার একটি স্থায়ী সমাধান না হলে আঞ্চলিক শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মনে করে ইরান।

 

সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই সংঘাতের অবসান, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং স্থগিত হয়ে থাকা পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনা পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে গত জুন মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

 

সেই সময় আন্তর্জাতিক মহল একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা করলেও, চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নের আগেই তা ভেস্তে যায়। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কিছুদিন পরেই হরমুজ প্রণালীতে অনুমোদিত ও নির্ধারিত সামুদ্রিক রুট থেকে বিচ্যুত হওয়ার অভিযোগে কয়েকটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে সরাসরি হামলা চালায় ইরান।

 

এই ঘটনাগুলো চুক্তিটিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে তোলে এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেকোনো দেশের জাহাজ চলাচলের আগে তেহরানের কাছ থেকে পূর্বানুমোদন নেওয়া সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক।

 

যে সকল বাণিজ্যিক বা সামরিক নৌযান এই নির্দেশ অমান্য করে ওই প্রণালী অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে, সেগুলোকে তারা নিয়মিত লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আসছে অথবা আটক করছে। ইরানের এই কঠোর অবস্থানের জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনীও প্রায়ই পারস্য উপসাগরে তাদের শক্তি প্রদর্শন করে আসছে এবং ইরানের উপকূলীয় ও সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে বিমান হামলা ও বোমা হামলা চালাচ্ছে।

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ এই প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে।

 

ফলে এই নৌপথ বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। ইরানের নতুন এই শর্তসাপেক্ষ প্রস্তাবটি একদিকে যেমন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে, তেমনি এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষাও বটে।

 

এখন পুরো বিশ্বের নজর ওয়াশিংটনের দিকে, তারা তেহরানের এই শর্তগুলো মেনে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর উদ্যোগে শামিল হবে কি না, নাকি সংঘাতের পথেই হাঁটবে, তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

 

- এএফপি