মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আট মার্কিন সেনার আহত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আট মার্কিন সেনার আহত
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে গত কয়েক সপ্তাহ আগে সংঘটিত একটি অতর্কিত সামরিক সংঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটজন মেরিন সেনা আহত হয়েছেন।

 

বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর ও কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে যে, ইরানি অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের অত্যন্ত নিখুঁত ও সরাসরি আঘাতে মার্কিন এই সেনাসদস্যরা আহত হন।

 

বর্তমান আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিরাজমান সামরিক উত্তেজনার বহুমুখী পরিস্থিতিতে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, যা দুইপক্ষের মধ্যকার চলমান সর্বাত্মক সংঘাতের ভয়াবহতা ও বহুমুখী ঝুঁকির একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

 

আহত সেনাসদস্যদের শারীরিক অবস্থা, আঘাতের প্রকৃতি এবং তাদের চিকিৎসার সামগ্রিক দিক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্রের বিধ্বংসী আঘাতে মেরিন সেনাদের শারীরিক জখম বা বাহ্যিক আঘাত সরাসরি প্রাণঘাতী বা অপারেশনালভাবে অত্যন্ত গুরুতর না হলেও তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর একটি সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল।

 

বিস্ফোরণের ফলে চারপাশে ছড়িয়ে পড়া অতিরিক্ত ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হওয়া, প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং মস্তিষ্কে ঝাঁকুনির মতো স্নায়বিক গুরুতর উপসর্গ দেখা দেওয়ায় চিকিৎসকদের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

 

চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করেছিলেন যে তারা সম্ভাব্য ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি বা টিবিআইয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছেন। সামরিক অভিযানের মাঠে এ ধরনের অদৃশ্য ও অভ্যন্তরীণ আঘাতগুলো অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে মারাত্মক মনে না হলেও পরবর্তী সময়ে মারাত্মক স্নায়বিক ও মানসিক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে, যে কারণে সামরিক চিকিৎসকরা অত্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা পরিচালনা করেছেন।

 

এই আকস্মিক সামরিক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সেনাসদস্যদের সুনির্দিষ্ট পদমর্যাদা এবং তাদের বর্তমান কর্মতৎপরতা সম্পর্কে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে যে, আহত মোট আটজন সদস্যের মধ্যে সাতজনই ছিলেন সাধারণ পদমর্যাদার এনলিস্টেড বা তালিকাভুক্ত মেরিন সেনা এবং বাকি একজন ছিলেন একজন দায়িত্বশীল ও পদস্থ কর্মকর্তা।

 

গত ১৪ সেপ্টেম্বর সংঘটিত ওই অপ্রত্যাশিত হামলার পরপরই তাঁদের অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পেশাদার ও উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। বর্তমানে তাঁদের শারীরিক অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি ঘটায় ওই আটজন সেনাসদস্যই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে নিজ নিজ কর্মস্থলে এবং স্ব স্ব দাপ্তরিক দায়িত্বে পুনরায় যোগদান করেছেন।

 

দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী এই আঞ্চলিক উত্তেজনার মাঝেও আহত সামরিক কর্মীদের দ্রুত সুস্থ হয়ে পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়া মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের জন্য কিছুটা স্বস্তির বিষয় বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সমর বিশেষজ্ঞরা।

 

হামলার শিকার হওয়ার সময় ওই সেনাসদস্যরা ঠিক কোন ভৌগোলিক অবস্থানে ছিলেন এবং কোন ধরনের বিশেষায়িত জলযানে দায়িত্ব পালন করছিলেন, সে বিষয়েও প্রতিবেদনে যথেষ্ট আলোকপাত করা হয়েছে।

 

দায়িত্বশীল মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রটি যখন আঘাত হানে, ঠিক সেই মুহূর্তে ওই মেরিন সেনারা একটি বিশেষায়িত ব্যাটালিয়ন ল্যান্ডিং টিমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে একটি সমুদ্রগামী জাহাজে তাদের পূর্বনির্ধারিত দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন।

 

তবে এই ঘটনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং কৌতূহলোদ্দীপক দিকটি হলো, ক্ষতিগ্রস্ত বা আক্রান্ত ওই জাহাজটি মার্কিন নৌবাহিনীর সরাসরি নিজস্ব কোনো যুদ্ধজাহাজ বা সামরিক জলযান ছিল না।

 

মার্কিন কর্মকর্তারা ওই জলযানের সুনির্দিষ্ট পরিচয়, মালিকানা বা এর সুনির্দিষ্ট ধরন সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থেকেছেন এবং সেটিকে কেবল অত্যন্ত সংক্ষেপে একটি সাধারণ ‘জাহাজ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা এই ঘটনার পেছনের গোয়েন্দা ও কৌশলগত গোপনীয়তার কঠোর দিকটিকে অত্যন্ত জোরালোভাবে নির্দেশ করে।

 

গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ সামরিক জোটের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযান ও বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন বিশ্বজুড়ে তাদের সামরিক হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ এবং এর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র জনমত ও গণমাধ্যমের কড়া নজরদারির মুখে পড়েছে।

 

যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত ও বস্তুনিষ্ঠ পরিস্থিতি এবং আহত বা নিহত সেনাসদস্যদের প্রকৃত সংখ্যা জনসমক্ষে প্রকাশে লুকোচুরি বা গোপনীয়তার সংস্কৃতি বজায় রাখার অভিযোগে অতীতেও মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও নীতি নির্ধারকদের পক্ষ থেকে নানামুখী প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।

 

চলমান এই দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাতে মার্কিন সেনাসদস্যদের হতাহতের সংখ্যার প্রতিবেদন এবং এর বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগে বারবার অসঙ্গতি ও তথ্যগত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে, যা মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সামগ্রিক নীতিগত স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় তৈরি করেছে।

 

সামরিক নীতি নির্ধারকদের এই তথ্য লুকানোর প্রবণতা আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে বরাবরই একটি নিয়মিত ও আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নিজস্ব দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ডেটাবেজ ‘ডিকাস’-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই সর্বাত্মক সামরিক সংঘাতে গত বুধবার, অর্থাৎ ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বমোট ৮৬ আগস্ট বা ৮৬১ জন সামরিক সদস্য বিভিন্ন মাত্রায় এবং নানা ধরনের দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন।

 

বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার সামরিক বাহিনীর জন্য এই বিপুল সংখ্যক আহতের পরিসংখ্যান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রের চরম তীব্রতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির ভয়াবহ বাস্তবতাকে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে উন্মোচন করে দেয়।

 

হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহকারী অত্যন্ত স্পর্শকাতর জলপথে এই ধরনের সামরিক সংঘাত কেবল আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তাকেই বিঘ্নিত করছে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘর্ষ বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের পথকে প্রতিনিয়ত আরও বেশি সংকুচিত ও অনিশ্চিত করে তুলছে।

 

- এনবিসি নিউজ