মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন বিমান ও ঘাঁটিতে ইরানের ভয়াবহ হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০১:২৪ পিএম

মার্কিন বিমান ও ঘাঁটিতে ইরানের ভয়াবহ হামলা
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত এক নতুন এবং বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। টানা নবম দিনের মতো ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর এবার কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তেহরান।

 

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং বিমানগুলোকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

 

এই পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে চরম যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সংঘাতের ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আন্তর্জাতিক মহল অনতিবিলম্বে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শান্তি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

 

ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, জর্ডানের আকাবা বিমানবন্দরে অবস্থানরত মার্কিন সি-১৭ সামরিক পরিবহন বিমান এবং পি-৮ নজরদারি বিমান লক্ষ্য করে তারা সুনির্দিষ্ট ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

 

এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেশ কয়েকটি মার্কিন বিমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রচারিত অপর এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে যে, তারা মুওয়াফফাক সালতি বা আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে তীব্র আক্রমণ চালিয়েছে।

 

এই সুপরিকল্পিত হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত অন্তত বিশটি হ্যাঙ্গার বা বিমান রাখার গ্যারেজ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সুনির্দিষ্ট হামলা মার্কিন বাহিনীর লজিস্টিক ও নজরদারি সক্ষমতার ওপর সরাসরি আঘাত হানার একটি সুস্পষ্ট বার্তা।

 

এর মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করতে চাইছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো তাদের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মধ্যেই রয়েছে। বিমানঘাঁটিতে হামলার পাশাপাশি আকাশসীমা রক্ষায়ও ইরান নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের দাবি করেছে।

 

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় কেরমানশাহ প্রদেশের ইসলামাবাদ-ই-গার্ব শহরের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ অত্যাধুনিক ড্রোনকে সফলভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং পরে সেটিকে ভূপাতিত করা হয়েছে।

 

মেহর নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি অত্যন্ত উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে এই মার্কিন ড্রোনটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

 

এই বিশেষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ইরানের জাতীয় সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, যা দেশের আকাশসীমায় যেকোনো বিদেশি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে।

 

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, উত্তর ইরাকে ভূপাতিত হওয়া একটি ইরানি ড্রোন নিষ্ক্রিয় করার সময় তাদের এক সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।

 

গত ১৮ জুলাই ড্রোনটি নিয়ে কাজ করার সময় হঠাৎ সেটি বিস্ফোরিত হলে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওই একই বিস্ফোরণে অপর এক মার্কিন সেনাসদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার স্বার্থে নিহত সেনার নাম বা পরিচয় এখনও প্রকাশ করেনি মার্কিন কর্তৃপক্ষ।

 

এর আগে, গত শুক্রবার জর্ডানে ইরানের চালানো এক ভয়াবহ হামলায় আরও দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং একজন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। সেন্টকম গত রোববার জানিয়েছে যে, হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে অজ্ঞাতপরিচয় কিছু দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজ সেনার বিষয়টি নিশ্চিত হতে সেই দেহাবশেষগুলো শনাক্তকরণের জন্য বর্তমানে নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

 

এই সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে গত মাসে স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। চুক্তিটি অকার্যকর হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

 

গত কয়েক দিনে এই উত্তেজনা তীব্র সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর বিধ্বংসী হামলা চালাচ্ছে। এই ভয়াবহ সংঘাতে এরই মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

 

তদুপরি, সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহে ব্যাপক মাত্রায় বিঘ্ন ঘটছে। জ্বালানি সংকটের এই প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির শঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করে তুলছে।

 

চলমান এই যুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে শত শত 'শাহেদ' ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এই শাহেদ ড্রোনগুলো তুলনামূলকভাবে স্বল্পমূল্যে উৎপাদন করা যায়, কিন্তু এগুলো অত্যন্ত বিস্ফোরক ক্ষমতাসম্পন্ন একমুখী বা আত্মঘাতী আক্রমণকারী অস্ত্র হিসেবে কাজ করে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি শাহেদ ড্রোন তৈরি করতে ইরানের খরচ হয় মাত্র ত্রিশ হাজার মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। ফলে বিপুল পরিমাণে এই ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো তেহরানের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সাশ্রয়ী।

 

এর বিপরীতে, এই ড্রোনগুলোকে মাঝপথে ধ্বংস বা ভূপাতিত করতে মার্কিন বাহিনী যে অত্যাধুনিক ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহার করে, তার প্রতিটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

 

তাছাড়া, অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় এসব ইন্টারসেপ্টর লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ধেয়ে আসা ছোট আকারের ড্রোনগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য এক বিশাল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুত কোনো কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান না এলে এই সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

- আল জাজিরা