পত্রিকাটির এক গভীর বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে যে, ট্রাম্পের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তগুলো তাকে কার্যত একটি ‘চলমান গণবিধ্বংসী অস্ত্র’-এর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক শক্তিতে পরিণত করেছে।
সম্প্রতি ইরান সংকটকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রশাসনের গৃহীত নীতিমালার তীব্র সমালোচনা করে ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের অহমিকা এবং সুনির্দিষ্ট কোনো সংকট ব্যবস্থাপনা কৌশলের অভাব গোটা বিশ্বকে এক ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মেহর নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে পার্স টুডে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনটি সামনে এনেছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের অন্যতম বিশিষ্ট লেখক, প্রবীণ সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক সাইমন টিসডেল তার এক সাম্প্রতিক নিবন্ধে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।
তিনি তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছেন। টিসডেলের মতে, বর্তমান বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ কেবল শত্রুদের সামরিক শক্তি বা চলমান সংঘাতের ভয়াবহ প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
বরং এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংকট হলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেকোনো সংঘাত বা উত্তেজনা প্রশমনের জন্য ওয়াশিংটনের কাছে সুস্পষ্ট, দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর কোনো কূটনৈতিক বা কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অহংকার এবং আত্মম্ভরিতাই বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর শত্রুতে পরিণত হয়েছে।
তার এই অপরিপক্ব ও হঠকারী আচরণের কারণেই বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী এক অনাকাঙ্ক্ষিত আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে ইরানের সঙ্গে চলমান গভীর সংকটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক শক্তিতে পরিণত হয়েছেন বলে সাইমন টিসডেল তার নিবন্ধে জোরালোভাবে উল্লেখ করেছেন।
এই স্পর্শকাতর সংঘাত মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যবস্থাপনার ধরন এবং আগ্রাসী নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে তো বটেই, বরং সমগ্র বিশ্বকে এমন এক গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখান থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের এই বিশ্লেষক ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে মূলত ট্রাম্পের কৌশলগত দূরদৃষ্টিহীনতা এবং সম্পূর্ণ হঠকারী ও একগুঁয়ে সিদ্ধান্তের প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা যদি এভাবে অব্যাহত থাকে, তবে তা অচিরেই একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সর্বাত্মক বৈশ্বিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যার পরিণতি হবে সমগ্র মানবজাতির জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক।
এই সংঘাতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপরীতমুখী দিকের প্রতিও আলোকপাত করেছে দ্য গার্ডিয়ান। পত্রিকাটি তাদের বিশ্লেষণে যুক্ত করেছে যে, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মূল প্রত্যাশা ছিল সামরিক হামলার মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়া এবং সেদেশের জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা।
কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে। ইরানের ওপর মার্কিন প্রশাসনের এই আগ্রাসী হামলা ইরানি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার পরিবর্তে সেদেশের অভ্যন্তরে সরকারের অবস্থানকে আরও বেশি সুসংহত ও শক্তিশালী করেছে।
বাইরের আক্রমণের মুখে পড়ে ইরানের সাধারণ মানুষ নিজেদের মধ্যেকার মতপার্থক্য ভুলে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন আগ্রাসন মূলত ইরানি নেতৃত্বকে তাদের দেশের ভেতরে জনমত অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে সংগঠিত করতে এবং নিজেদের গৃহীত কঠোর নিরাপত্তা নীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত যৌক্তিক ও ন্যায্য হিসেবে তুলে ধরতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছে।
নিবন্ধের শেষাংশে, বর্তমান ইরান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত বিজয় সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার যুদ্ধবিষয়ক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিট হেগসেটের দেওয়া বক্তব্যের অত্যন্ত কড়া ও যুক্তিনির্ভর সমালোচনা করেছে প্রভাবশালী এই ব্রিটিশ দৈনিকটি।
পত্রিকাটির মতে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের ‘মহান বিজয়’ অর্জনের যে চটকদার দাবি করা হচ্ছে, তা মাঠপর্যায়ের চরম বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে তাদের প্রধান কৌশলগত ও রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
অপরদিকে, এই অবিমৃষ্যকারী ও প্রলম্বিত যুদ্ধের ফলে প্রতিনিয়ত যে বিপুল পরিমাণ মানবিক বিপর্যয় ঘটছে এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হচ্ছে, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেবল বেড়েই চলেছে, যা আখেরে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।