ফিলিস্তিনের চলমান সংঘাত এবং ভয়াবহ মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আর্জেন্টিনার নিঃশর্ত ও জোরালো সমর্থন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটিকে এক কঠিন ও কোণঠাসা পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর বিতর্কিত সামরিক পদক্ষেপগুলোকে অন্ধভাবে সমর্থন করতে গিয়ে আর্জেন্টিনা কেবল তার দীর্ঘদিনের মিত্রদেরই হারায়নি, বরং বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক ধরনের অঘোষিত একঘরে অবস্থার শিকার হয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আর্জেন্টিনার নতুন নেতৃত্ব দেশের বৈদেশিক নীতিতে ব্যাপক রদবদল আনেন। ঐতিহাসিকভাবে দেশটি মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিকামী অবস্থান বজায় রেখে আসছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে সরাসরি ইসরায়েলের কট্টরপন্থী সরকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, মানবাধিকার কাউন্সিল এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর ক্ষেত্রেও আর্জেন্টিনা বিশ্বমতের বিরুদ্ধে গিয়ে ইসরায়েলের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
লাতিন আমেরিকার অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো, যারা দীর্ঘদিন ধরে আর্জেন্টিনার মিত্র, তারা যখন গাজায় সামরিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন বা রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, ঠিক তখন আর্জেন্টিনার এই বিপরীতমুখী অবস্থান পুরো মহাদেশে তাদের সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।
এই একগুঁয়ে কূটনৈতিক অবস্থানের কারণে দেশটিকে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু দৃশ্যমান ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। প্রথমত, আরব বিশ্ব এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্কে ব্যাপক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ আর্জেন্টিনার এই একপেশে নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে, যা দেশটির জন্য ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থনৈতিকভাবে চরম বিপর্যস্ত একটি দেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মতো একটি বিশাল বাজার এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের অসন্তোষ অর্জন করা মোটেও কোনো দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নয় বলে মনে করছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদরা।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোর্চায় আর্জেন্টিনা তার নেতৃত্বের জায়গা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যখন চলমান সামরিক অভিযানকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমতুল্য বলে আখ্যায়িত করছে, তখন সেই আগ্রাসনের পাশে দাঁড়ানো আর্জেন্টিনার অতীত গণতান্ত্রিক রেকর্ডের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক।
এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আর্জেন্টিনার বর্তমান মানবাধিকার নীতি এবং বৈশ্বিক শান্তির প্রতি তাদের অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও সরকারের এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। দেশের সাধারণ জনগণ বর্তমানে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, দেশের এই নাজুক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অযাচিতভাবে একটি সংঘাতময় পক্ষকে সমর্থন করে সরকার দেশের জন্য নতুন বিপদ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি ডেকে আনছে। রাজধানী বুয়েনস আইরেসসহ বিভিন্ন প্রধান শহরে মানবাধিকারের পক্ষে এবং সরকারের এই অন্ধ তোষণ নীতির বিরুদ্ধে বিশাল সব প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সাধারণ মানুষের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করা জাতীয় স্বার্থের জন্য কোনোভাবেই লাভজনক নয়; বরং এটি দেশের জন্য একটি সম্পূর্ণ আত্মঘাতী কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান নেতৃত্ব মূলত পশ্চিমা শক্তিগুলোর সুদৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই এই ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছেন। তারা হয়তো আশা করেছিলেন যে, নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়ালে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তা পাওয়া যাবে।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশার সঙ্গে একেবারেই মিলছে না। বরং বিশ্বব্যাপী যখন মানবিক বিপর্যয় নিয়ে প্রবল চাপ তৈরি হচ্ছে, তখন অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে আর্জেন্টিনাকেও সেই কূটনৈতিক চাপের বিশাল দায়ভার বহন করতে হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি হলো একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার জায়গা। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রতি একচেটিয়া সমর্থন ব্যক্ত করে আর্জেন্টিনা বিশ্বমঞ্চে যে অবস্থান তৈরি করেছে, তা তাদের জন্য কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
আঞ্চলিক মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্নতা, আন্তর্জাতিক ক্ষোভ এবং অভ্যন্তরীণ সমালোচনা-সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুকে সমর্থনের জেরে আর্জেন্টিনাকে যে চড়া মূল্য চোকাতে হচ্ছে, তা দেশটির ভবিষ্যৎ বৈদেশিক নীতি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথকে আরও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলবে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের চোখে, মানবাধিকার ও শান্তির পক্ষে দাঁড়ানোর বদলে আগ্রাসনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় আর্জেন্টিনা দৃশ্যতই এক বিশাল কূটনৈতিক পরাজয় বরণ করেছে।