মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন সেনা নিহতের ঘটনায় ইরানকে চরম মূল্য দিতে হবে, হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম

মার্কিন সেনা নিহতের ঘটনায় ইরানকে চরম মূল্য দিতে হবে, হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
ছবি : File Photo

মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে ইরানকে এক অভূতপূর্ব ও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংঘাতপূর্ণ এই অঞ্চলে যেকোনো মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে তার জন্য তেহরানকে বহুগুণ বেশি চড়া মূল্য চোকাতে হবে বলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন।

 

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে যখন এক অস্থিতিশীল ও উদ্বেগজনক পরিবেশ বিরাজ করছে, ঠিক তখনই নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের এই অনড় ও আক্রমণাত্মক অবস্থানের কথা প্রকাশ্যে ব্যক্ত করেন।

 

তাঁর এই দ্ব্যর্থহীন বার্তা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও একধাপ উত্তপ্ত করে তুলতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তায় অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখেছেন যে, যতবারই ইরানের কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপে একজন মার্কিন সেনাকে হত্যার শিকার হতে হবে, ঠিক ততবারই তার প্রতিদান হিসেবে ইরানকে কল্পনাতীত ও বহুগুণ মূল্য দিতে বাধ্য করা হবে।

 

শুধু মৌখিক হুঁশিয়ারি দিয়েই ক্ষান্ত হননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট; তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁর এই কঠোর নীতির বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে পেন্টাগন ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

 

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল কেইনসহ মার্কিন সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ নেতাদের সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

মূলত দক্ষিণ ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত ও তীব্র বিমান হামলা এবং এর জবাবে তেহরানের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানার যে ভয়ংকর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় ট্রাম্পের এই কড়া মন্তব্য সামনে এলো।

 

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের দেওয়া সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে মার্কিন বাহিনীর বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, গত সপ্তাহান্তে জর্ডানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে দুজন এবং উত্তর ইরাকে অপর একজনসহ মোট তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

 

এই প্রাণহানির ঘটনা ওয়াশিংটনকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। উল্লেখ্য, এই চলমান সামরিক সংঘাত নিরসনে এবং যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল আলোচিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

 

কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলের সমস্ত আশাবাদ ব্যর্থ করে দিয়ে সেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও উভয় দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা, গোলাগুলি ও পাল্টাপাল্টি হামলা এখনো পুরোদমে অব্যাহত রয়েছে।

 

তবে মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, উভয় পক্ষকে পুনরায় সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে বর্তমানে দশ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকরের বিষয়ে নিবিড়ভাবে চিন্তাভাবনা চলছে।

 

একই সঙ্গে সংঘাত পুরোপুরি বন্ধের শর্তে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি থেকে বিভিন্ন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টিও কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদিকে যেমন চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন ও হরমুজ প্রণালিতে ক্রমাগত হামলা বন্ধ করার জন্য ইরানের ওপর প্রচণ্ড সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছেন, ঠিক তেমনি নিহত মার্কিন সেনাদের জন্য ইরানকে চড়া মূল্য দিতে বাধ্য করার নীতিতেও তিনি সম্পূর্ণ অটল রয়েছেন।

 

তবে এত সামরিক উত্তেজনার পরও পর্দার আড়ালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি ক্ষীণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারা এখনো বজায় রয়েছে। এদিকে একই দিনে দেওয়া সম্পূর্ণ পৃথক একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সুরক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত জোরালো ও প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা মেরুকরণ ও আইনি বিতর্কের মধ্যে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তাঁর আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে কোনোভাবেই সে দেশের মাটিতে গ্রেপ্তার হবেন না।

 

ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় অভিযোগ করেন যে, নেতানিয়াহু মূলত ইরানের সেই স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই নিরলস লড়াই করছেন, যারা সম্প্রতি নিজেদের দেশে ৫২ হাজার নিরীহ ও অধিকারকামী বিক্ষোভকারীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

 

এছাড়া গত ৪৭ বছর ধরে আমেরিকান সৈন্যসহ অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে হত্যার পেছনেও তেহরানের প্রত্যক্ষ ইন্ধন রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ট্রাম্পের সুস্পষ্ট মত হলো, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কেবলমাত্র তারাই আইনের আওতায় গ্রেপ্তার হওয়ার যোগ্য, যারা ইরানকে বর্তমানের এই চরম ধ্বংস, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সংঘাতের দিকে টেনে নিয়ে গেছে।

 

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক নতুন ও বিতর্কিত মেরুকরণ। এর আগে প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি অত্যন্ত বিস্ফোরক এক মন্তব্য করেছিলেন।

 

তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি কর্তৃক অভিযুক্ত একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে অবিলম্বে নেদারল্যান্ডসের হেগে পাঠানো উচিত।

 

এমনকি তাঁর নগর প্রশাসনের আইন বিভাগ নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের আইনি দিকগুলো নিয়ে নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করছে বলেও তিনি ওই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আইনি জটিলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহলের এই তীব্র টানাপোড়েনের মাঝেই শেষ পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী।

 

উদ্ভূত এই জটিল পরিস্থিতি ও নানামুখী চাপ বিবেচনায় নিয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চলতি মাসে নির্ধারিত তাঁর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্র সফরটি আপাতত পিছিয়ে আগামী সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেছেন।

 

- আনাদুলু