ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক সাম্প্রতিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে মঙ্গলবার এই তথ্যটি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। ওই বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই নতুন বিধিমালা আগামী সপ্তাহের শুরুতেই পুরোদমে কার্যকর করা হতে পারে বলে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই প্রায় ৬০টি দেশের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক আরোপের একটি বিস্তারিত ও চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন। এই অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ এবং সম্ভাব্য বাণিজ্য যুদ্ধের গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে।
এই আকস্মিক ও কঠোর বাণিজ্য নীতির আইনি ভিত্তি নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক ও আইনি মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগের বিশেষ সুযোগ বাতিল করে দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের ওই ঐতিহাসিক আদেশের পর মার্কিন প্রশাসনকে তাদের বাণিজ্য নীতির বাস্তবায়নে বিকল্প আইনি পথের সন্ধান করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউস এই শুল্ক আরোপের পদক্ষেপকে বৈধতা দিতে ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার নিবিড় প্রয়োগ করতে যাচ্ছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরপূর্বক শ্রমপ্রথা বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে আইনি তদন্তের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এই ভিত্তিটি কাজে লাগানো হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে সুপ্রিম কোর্টের অপর এক রায়ে ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রবর্তিত পারস্পরিক শুল্ক নীতি সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয়েছিল, যার ফলে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় ব্যাপক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রশাসন পরিচালনার শুরু থেকেই বাণিজ্য ক্ষেত্রে আগ্রাসী নীতি অনুসরণ করে আসছেন এবং সম্প্রতি তিনি বেশ কিছু দেশের ওপর শুল্ক আরোপের পরিধি অভাবনীয় মাত্রায় প্রসারিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক মিত্র ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই প্রতিবেশী রাষ্ট্র কানাডা থেকে আমদানি করা বিভিন্ন পণ্যের ওপর বিস্ময়করভাবে ৫০ শতাংশ এবং লাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের একতরফা ঘোষণা দিয়েছেন।
এই ধরনের সংরক্ষণশীল বাণিজ্য নীতি আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা বারবার সতর্ক করে আসছেন। তবে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরেই এই একরোখা বাণিজ্য নীতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা বিরাজ করছে।
নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, হোয়াইট হাউসের ঊর্ধ্বতন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে, ২০২৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তিগুলো যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত বা বাতিল না হয়, সে বিষয়েও তারা তাঁকে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন।
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও সাধারণ ভোক্তাদের কথা বিবেচনায় রেখে নীতিনির্ধারকেরা কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্যকে এই নতুন শুল্কের আওতা থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।
পাশাপাশি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম-সম্পর্কিত নির্দিষ্ট কিছু সংবেদনশীল পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত শুল্কের হার কমিয়ে আগের চেয়ে কিছুটা শিথিল ও নমনীয় করারও জোর সুপারিশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক অত্যন্ত জটিল ও উত্তেজনাকর মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত সামনে এলো।
মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ও ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার পটভূমিতে এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপটি গ্রহণ করা হয়েছে। একদিকে সামরিক সংঘাত ও কূটনীতির এক শ্বাসরুদ্ধকর অচলাবস্থা চলছে, অন্যদিকে এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড ৪ ডলার অতিক্রম করেছে, যা সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনের ব্যয়ের ওপর এক বিশাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ সৃষ্টি করেছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বর্তমানে চরম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি দেশবাসীকে বারবার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাস্তব পরিসংখ্যানে তার কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটছে না।
চলতি মাসের শুরুতে পরিচালিত এক স্বনামধন্য জাতীয় জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, মার্কিন ভোটারদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় মোকাবেলা ও মূল্যস্ফীতি রোধে বর্তমান প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপগুলোতে তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
সর্বশেষ প্রস্তাবিত এই শুল্ক নীতির আওতায় মূলত জোরপূর্বক শ্রমপ্রথা ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এর পাশাপাশি, বাজারে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের উদ্যোগে সম্পূর্ণ পৃথক একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে।
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই তদন্তের আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উদীয়মান পরাশক্তি চীন, ভারত, জাপান, মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির বেশ কয়েকটি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলোর মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রশাসন বিশ্ববাণিজ্যে নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ পুনরায় সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা।