এল সালভাদরের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত ২ জুলাই একটি সুনির্দিষ্ট প্রাচীন সমাধিস্থল থেকে প্রথমবারের মতো এই ঐতিহাসিক দেহাবশেষগুলোর অংশবিশেষ অত্যন্ত সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে উত্তোলন করা হয়।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও পারিপার্শ্বিক ঐতিহাসিক নিদর্শন বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রত্নতত্ত্ববিদরা জোরালোভাবে ধারণা করছেন যে, উদ্ধারকৃত এই অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৮৫০ সালের হতে পারে।
এই যুগান্তকারী ও অভাবনীয় আবিষ্কার মেসো আমেরিকা অঞ্চলের সুপ্রাচীন ইতিহাস, প্রাচীন মানব সভ্যতার বিবর্তন এবং ওই অঞ্চলের মানুষের অতীত জীবনযাত্রা সম্পর্কে আধুনিক বিশ্বের সামনে নতুন করে ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
শুধুমাত্র মানব দেহাবশেষই নয়, ওই প্রাচীন সমাধিস্থলটি খনন করার সময় সেখানে আরও বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌতূহলোদ্দীপক ঐতিহাসিক নিদর্শন খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো উসুলুতান শিল্পের সুনিপুণ আদলে তৈরি করা মাটি দিয়ে নির্মিত একটি ছোট আকারের পাত্র, যার বাইরের দিকের আকৃতি দেখতে অবিকল একটি সামুদ্রিক কচ্ছপের মতো।
প্রাচীন যুগের মৃৎশিল্পের এই অনন্য নিদর্শনটি সেই সময়ের মানুষের শৈল্পিক জ্ঞান ও প্রকৃতির সঙ্গে তাদের গভীর সংযোগের বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এর পাশাপাশি, ওই নির্দিষ্ট সমাধিস্থলের গভীরে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন সময়ে জমা হওয়া আগ্নেয়গিরির পুরু ছাইয়ের স্তরের নিচে অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় কাসাভা বা শর্করা জাতীয় কন্দ গাছের ডালপালার প্রাচীন অবশিষ্টাংশও আবিষ্কার করা হয়েছে।
হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির বৈরী আচরণ সত্ত্বেও আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে থাকার কারণে প্রাকৃতিকভাবেই এই জৈব উপাদানগুলো চমৎকারভাবে সংরক্ষিত ছিল। এই অমূল্য উপাদানগুলো ওই অঞ্চলের তৎকালীন ভৌগোলিক পরিবেশ, কৃষি ব্যবস্থা এবং প্রাচীন অধিবাসীদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে গবেষকদের অত্যন্ত মূল্যবান ও বিস্তারিত ধারণা প্রদান করবে বলে জোরালো আশা করা হচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া এই মানব দেহাবশেষটির শারীরিক অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা উদ্ধারকারী গবেষকদের মনে গভীর কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। খননকার্যে যুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, মাটি খুঁড়ে কঙ্কালটি স্বাভাবিক শায়িত অবস্থার বদলে একেবারে উপুড় করা অবস্থায় পাওয়া গেছে।
এই অস্বাভাবিক ও রহস্যময় ভঙ্গিতে সমাহিত করার পেছনে তৎকালীন সমাজের কোনো বিশেষ ধর্মীয় আচার, শাস্তি প্রদান প্রক্রিয়া অথবা অন্য কোনো সামাজিক কারণ জড়িয়ে ছিল কি না, তা নিয়ে এখন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিস্তর গবেষণা ও বিশ্লেষণ চলছে।
আধুনিক বিজ্ঞানের সহায়তায় এই প্রাচীন মানব কঙ্কালের প্রকৃত বয়স সুনির্দিষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে নিশ্চিত করার জন্য খুব শিগগিরই উন্নত প্রযুক্তির রেডিওকার্বন ডেটিং বা তেজস্ক্রিয় কার্বন পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে।
শুধু তাই নয়, মৃত ওই প্রাচীন মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণ, শারীরিক গঠন, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং তার মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে নিখুঁত ও সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করার মহান উদ্দেশ্যে অত্যাধুনিক ডিএনএ বিশ্লেষণেরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগুলোর চূড়ান্ত ফলাফল হাতে এলে প্রাচীন মেসো আমেরিকার জনতাত্ত্বিক ইতিহাস ও নৃতাত্ত্বিক গঠন আরও বেশি স্পষ্ট ও নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
এই অনবদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পর এল সালভাদরের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, অ্যান্টিগুয়ো কুসকাতলানের এই সুনির্দিষ্ট স্থানটিতে হয়তো এমন আরও অনেক অজানা ও রহস্যময় সমাধি মাটির নিচে নিভৃতে লুকিয়ে থাকতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো ঐতিহাসিক সত্যকে বিশ্বের সামনে নিয়ে আসবে।
এই নতুন আবিষ্কার স্বভাবতই দেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বিখ্যাত চালচুয়াপা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। উল্লেখ্য, গত শতাব্দীর ১৯৭০-এর দশকে চালচুয়াপায় ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী খননকাজ চালিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা একসঙ্গে অন্তত ৩৩ জনের মানব দেহাবশেষ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে সেই চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারটিকে মেসো আমেরিকা অঞ্চলে মানব বলির সবচেয়ে প্রাচীন ও অকাট্য প্রমাণ হিসেবে আজ অবধি বিবেচনা করা হয়ে থাকে। প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, সেই সময় চালচুয়াপা থেকে মোট ২৬টি সম্পূর্ণ মানব কঙ্কাল, চারটি আংশিক কঙ্কাল এবং তিনটি শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়েছিল।
সবচেয়ে ভয়ংকর ও লোমহর্ষক বিষয় হলো, তাদের মধ্যে অনেককেই ঠিক বর্তমান উদ্ধার হওয়া কঙ্কালটির মতোই উপুড় করা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, যাদের হাত ও পা অত্যন্ত শক্ত করে বাঁধা ছিল বলে গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছিলেন।
এমনকি বেশ কয়েকটি দেহাবশেষে নির্মম অঙ্গহানি এবং নিষ্ঠুরভাবে শিরশ্ছেদ করার স্পষ্ট ও ভয়াবহ প্রমাণও মিলেছিল। সেই রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিবেচনা করে বর্তমান উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষটির সঙ্গেও প্রাচীনকালের কোনো মানব বলি প্রথা বা নির্মম শাস্তির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা, আলোচনা ও বিস্তৃত গবেষণার সূচনা হয়েছে।