দেশটির নাগরিকরা তেল বা জ্বালানির উচ্চমূল্য পছন্দ না করলেও মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালিত এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নেননি। একই সঙ্গে তেহরানের ওপর সামরিক চাপ ও বিমান হামলা অব্যাহত রাখার চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে তাদের বিভিন্ন পদক্ষেপের জন্য বড় ধরনের মূল্য চুকাতে হবে এবং মার্কিন বাহিনীর অব্যাহত হামলায় দেশটি বর্তমানে ধসের প্রান্তসীমায় উপনীত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের জনপ্রিয়তা ও এর স্থায়িত্ব নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়।
বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালনরত মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে এই সংঘাতের প্রতি কতটা জনসমর্থন রয়েছে, সে বিষয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিকরা।
এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, আমেরিকান জনগণ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে মোটেও অবস্থান নেয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক যে মার্কিন নাগরিকরা আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের অতিরিক্ত দাম সহ্য করতে চান না।
কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তারা ইরানের বিরুদ্ধে সরকারের নেওয়া সামরিক সিদ্ধান্তের বিরোধী। নিজের দাবির সপক্ষে ট্রাম্প সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপের কথা তুলে ধরে দাবি করেন যে, নতুন একটি পরিসংখ্যানে এই বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।
তবে বক্তব্য প্রদানের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক কোন নির্দিষ্ট সংস্থার বা কোন সময়ের জনমত জরিপের ওপর ভিত্তি করে এই দাবি করেছেন, তা সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট বা ব্যাখ্যা করেননি।
বিপরীতে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বাধীন জরিপ সংস্থা ও বিশ্লেষকদের প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে ট্রাম্পের এই দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বেশ কিছু অমিল বা বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হয়।
এর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য মার্কিন জনমত জরিপে দেখা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র যে বড় ধরনের হামলা শুরু করেছিল, তা নিয়ে মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ক্ষোভ ও বিরোধিতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচকরা ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই সামরিক অভিযানকে কোনো উসকানি ছাড়াই চালানো এক তরফা বা 'অপ্ররোচিত আক্রমণ' হিসেবে অভিহিত করে আসছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক সীমান্ত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি কর্তৃক পরিচালিত বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।
এর ফলে উভয় দেশের মধ্যকার সামরিক ভারসাম্য ও উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। এ ছাড়া ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতিরোধ এবং একই সঙ্গে মিত্র দেশগুলোর ওপর প্রভাব নিয়ে এই অঞ্চলে একটি বহুমুখী যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এসব আঞ্চলিক জটিলতা ও সেনা হতাহতের ঘটনা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন তাদের বর্তমান কঠোর সামরিক অবস্থান থেকে এতটুকু সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বজায় রাখার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে।
একদিকে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া দেশটির বৈশ্বিক কৌশলগত অবস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
তবুও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন প্রকাশ্য ও অনমনীয় মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন ইরানের ওপর সর্বাত্মক সামরিক ও কৌশলগত চাপ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। তেহরানের সঙ্গে চলমান এই অচলাবস্থা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শান্তিকেই বিনষ্ট করছে না, বরং সমগ্র বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক গভীর কালো ছায়া ফেলছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে মার্কিন প্রশাসনের এই আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আর কী রূপ নেয়।