আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসন হুথিদের স্বতন্ত্র কোনো গোষ্ঠী হিসেবে না দেখে তাদের ইরানের কৌশলগত সামরিক হাতিয়ার হিসেবেই বিবেচনা করছে।
ফলে ভবিষ্যতে লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর বা এর আশপাশের অঞ্চলে যেকোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে যুক্তরাষ্ট্র তার জন্য সরাসরি ইরানকেই জবাবদিহির আওতায় আনবে বলে ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক বিবৃতিতে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।
নিজের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বিস্তারিত বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ওই পোস্টে তিনি ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের সরাসরি ‘ইরানের প্রতিনিধিত্বকারী বা প্রক্সি গোষ্ঠী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বার্তার অর্থ হলো মধ্যপ্রাচ্যে হুথিদের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের নেপথ্যে ইরানের প্রত্যক্ষ মদদ, অর্থায়ন ও সমরাস্ত্র সরবরাহ রয়েছে বলে ওয়াশিংটন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বার্তায় উল্লেখ করেন যে, হুথিদের দ্বারা পরিচালিত যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে আর কেবল ওই নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নয়, বরং সরাসরি তাদের প্রধান মদদদাতা রাষ্ট্র ইরানকেই চূড়ান্তভাবে দায়ী করবে এবং সে অনুযায়ী পরবর্তী সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।
বিগত দিনগুলোর সামরিক তৎপরতা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন যে, প্রায় এক বছর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী হুথিদের লক্ষ্য করে অত্যন্ত শক্তিশালী ও সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল।
তার দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সেই কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পর হুথি গোষ্ঠীটি বেশ কিছুদিন নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল এবং লোহিত সাগর অঞ্চলে একধরনের আপেক্ষিক নীরবতা বজায় রেখেছিল। মার্কিন প্রশাসনের সেই সময়কার প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা ও অবকাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছিল বলেই ট্রাম্প মনে করেন।
তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও গোষ্ঠীটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি নতুন করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাবলির ওপর আলোকপাত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার পোস্টে অভিযোগ করেন যে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে হুথি বিদ্রোহীরা তাদের পূর্বের নীরবতা ভেঙে আবারও অঞ্চলে আগ্রাসী তৎপরতা ও সামরিক হামলা শুরু করেছে।
তিনি একটি নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করে জানান যে, গত রাতে গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের মালিকানাধীন দুটি বাণিজ্যিক বা তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালিয়েছে। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন যে, ভবিষ্যতে যদি তারা পুনরায় এই ধরনের কোনো হামলার দুঃসাহস দেখায় বা আন্তর্জাতিক নৌপথে বিঘ্ন ঘটায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে এর জন্য ইরানকে সরাসরি দায়ী করবে।
কারণ হিসেবে তিনি আবারও স্মরণ করিয়ে দেন যে, হুথিরা মূলত ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নির্দেশে পরিচালিত একটি প্রক্সি মাত্র। আর এমনটি ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে ইরান এবং হুথি-উভয়ের বিরুদ্ধেই নজিরবিহীন ও অত্যন্ত কঠোর সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বার্তায় সৌদি আরবের দুটি জাহাজে হুথিদের হামলার বিষয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করেছেন, তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর স্বাধীন অনুসন্ধানে তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
নিরপেক্ষ কোনো সূত্র, নৌ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা বা সৌদি আরবের সরকারি পর্যায় থেকে এই হামলার তথ্যের কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা বা প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরিতাকে কেন্দ্র করে নতুন করে চরম উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য শুধু একটি সাধারণ রাজনৈতিক সতর্কবার্তা নয়, বরং এটি ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক নীতির আরও আগ্রাসী রূপ নেওয়ার এবং ইরানকে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।