মধ্যপ্রাচ্যের চরম সংঘাতময় পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং সরাসরি হামলার প্রভাব এখন অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠছে প্রেসিডেন্টের নিজস্ব জনপ্রিয়তার সূচকে। সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক মানের জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ইরান নীতি ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের সমর্থন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
বিশ্বখ্যাত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট এবং সিএনএনের যৌথ পর্যালোচনায় প্রকাশিত এই চাঞ্চল্যকর তথ্যে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশের মাটিতে নতুন করে কোনো দীর্ঘমেয়াদী ও রক্তাক্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে দেশটির সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, উদ্বেগ ও অসন্তোষ কতটা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত প্রভাবশালী গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট পরিচালিত সর্বশেষ এই বিস্তৃত জনমত জরিপে এক অভূতপূর্ব চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। জরিপের প্রাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইরান সংঘাত মোকাবিলার প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিচালনা দক্ষতার ক্ষেত্রে ‘নেট অনুমোদন’ বা নিট সমর্থনের সূচক বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪০ পয়েন্টে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্টের আন্তর্জাতিক সামরিক হস্তক্ষেপ বা যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম বিপর্যয়কর ও নজিরবিহীন একটি চিত্র। জনপ্রিয়তার এই রেকর্ড পরিমাণ পতনের বিষয়ে সিএনএনের প্রধান তথ্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হ্যারি এন্টেন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।
তিনি ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক জনপ্রিয়তার সূচককে ‘ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত অজনপ্রিয়’ একটি চরম পরিস্থিতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত কোনো দেশ যখন বিদেশের মাটিতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন সাময়িকভাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের মানুষ প্রেসিডেন্টের পক্ষে অবস্থান নেয়।
তবে ট্রাম্পের এই ইরান অভিযানের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই ঘটেছে সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা, যা মার্কিন রাজনীতিতে এক বিরল পর্যবেক্ষণ। জরিপের বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিভিন্ন সামরিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন জনগণের মনোভাব নেতিবাচক দিকে মোড় নিতে শুরু করে।
আন্তর্জাতিক স্তরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দিন যত গড়াচ্ছে, ট্রাম্পের এই সামরিক অভিযানের প্রতি জনসমর্থনও ততটাই ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে পরিচালিত প্রধান প্রধান বৈদেশিক হস্তক্ষেপগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের এই ইরান অভিযানের প্রতি সমর্থনের হার এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন এবং সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে অবস্থান করছে।
অতীতে ভিয়েতনাম, ইরাক কিংবা আফগানিস্তান যুদ্ধের সূচনা পর্বেও মার্কিন জনগণের মাঝে যে প্রাথমিক সমর্থন দেখা গিয়েছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান নীতির ক্ষেত্রে সেই ন্যূনতম সমর্থনেরও স্পষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জরিপের নজিরবিহীন ফলাফল মূলত ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের একপাক্ষিক সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মার্কিন সাধারণ নাগরিকদের প্রবল বিরোধিতারই এক অকাট্য প্রতিফলন।
অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহত সামরিক অপারেশনের বিরাট অর্থনৈতিক ব্যয়, মার্কিন সৈন্যদের জীবনহানির চরম ঝুঁকি এবং একই সাথে সমগ্র অঞ্চল জুড়ে একটি অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ভয় মার্কিন সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
সাধারণ আমেরিকান নাগরিকরা স্পষ্টভাবেই চান না যে তাঁদের দেশ নতুন করে কোনো অনিশ্চিত সংঘাতের ভেতরে ঢুকে পড়ুক। ফলে সরকারের এই অবিবেচকমূলক সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে, যা শেষ পর্যন্ত জনমত জরিপে মাইনাস ৪০ পয়েন্টের মতো একটি মারাত্মক ধসের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ওয়াশিংটন পোস্ট ও সিএনএনের এই যৌথ পর্যালোচনা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে মার্কিন নীতির এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ওপর এক নতুন কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
ইরানে তীব্র হামলা চালিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের একক প্রভাব ও শক্তি জাহির করার যে কৌশল ট্রাম্প গ্রহণ করেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জনভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে।
নিজ দেশের জনগণের এই অভাবনীয় অনাস্থা এবং প্রতিনিয়ত হ্রাস পেতে থাকা সমর্থন স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সাধারণ আমেরিকানরা এই সামরিক অভিযানকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছেন না। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জনগণের এই চরম অসন্তোষ আগামী দিনে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বৈশ্বিক রূপরেখা ও সামরিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।