শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রকোপে যুক্তরাষ্ট্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম

পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রকোপে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে গত পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক হামের প্রকোপ মোকাবিলা করছে। একসময় যে রোগটিকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব হয়েছিল, তা আজ পুনরায় দেশটিতে এক গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটের জন্ম দিয়েছে।

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগেও এমন একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের আকস্মিক ও বিপজ্জনক প্রত্যাবর্তনের মূল কারণ হিসেবে সাধারণ মানুষের মধ্যে টিকা নেওয়ার প্রতি ক্রমবর্ধমান অনীহা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

আধুনিক বিশ্বের অন্যতম উন্নত এই দেশটিতে হামের এমন প্রবল বিস্তার আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য মহলেও ব্যাপক শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা ‘রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র’ সম্প্রতি এই প্রাদুর্ভাবের অত্যন্ত ভয়াবহ ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।

 

গত শুক্রবার সংস্থাটির প্রকাশিত সর্বশেষ ও হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলমান ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে মোট দুই হাজার তিনশো আঠারোটি হামের সংক্রমণ আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।

 

বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে সংক্রমণের এই পরিসংখ্যান চিকিৎসকদের চরমভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কারণ, এই সংখ্যা ইতোমধ্যেই বিগত ২০২৫ সালের হামে আক্রান্তের মোট সংখ্যাকে ব্যাপকভাবে ছাড়িয়ে গেছে।

 

গত বছর দেশটিতে রেকর্ড সংখ্যক দুই হাজার দুইশো ঊননব্বই জন হামে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে দুই নিষ্পাপ শিশুসহ অন্তত তিনজনের অকাল মৃত্যু হয়েছিল। চলতি বছরের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে সংক্রমণের হার এবং প্রাণহানির সংখ্যা অতীতের সব দুর্ভাগ্যজনক রেকর্ড ভেঙে ফেলতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং বিপজ্জনক ভাইরাসজনিত রোগ। প্রাথমিকভাবে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে তীব্র জ্বর, শ্বাসতন্ত্রের নানাবিধ জটিলতা এবং ত্বকের উপরিভাগে লালচে ফুসকুড়ি বা দাগ দেখা দেয়।

 

সাধারণ উপসর্গগুলো অনেক সময় সর্দি-জ্বরের মতো মনে হলেও, এর অভ্যন্তরীণ ক্ষতিকর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে শিশু এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস আরও মারাত্মক ও প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে।

 

এসব মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ফুসফুসের তীব্র সংক্রমণ বা নিউমোনিয়া এবং মস্তিষ্কের বিপজ্জনক প্রদাহ। চিকিৎসকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, মস্তিষ্কের এই প্রদাহ রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী স্নায়বিক বৈকল্য, মারাত্মক স্বাস্থ্যগত পঙ্গুত্ব এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিরাট ও স্মরণীয় অর্জন ছিল হাম নির্মূলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। দেশব্যাপী পরিচালিত অত্যন্ত সফল ও বিস্তৃত টিকাদান কর্মসূচির অভাবনীয় সাফল্যের কারণে আজ থেকে প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে, অর্থাৎ ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে হামমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

 

এটি ছিল আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও সরকারি নীতিমালার এক অসামান্য বিজয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সাফল্যের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে যেতে শুরু করেছে। নিয়মিত টিকাদানের হার উদ্বেগজনকভাবে কমে যাওয়া এবং জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও বিজ্ঞানীদের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস দেশটিতে আবারও এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের পুনরুত্থানের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় আইন অনুযায়ী শিশুদের জন্য হামের টিকা গ্রহণ করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক হলেও, এর বাস্তব প্রয়োগে বেশ কিছু শিথিলতা ও ফাঁকফোকর রয়েছে। দেশটির অনেক অঙ্গরাজ্যে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে টিকা গ্রহণের এই কঠোর বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি নেওয়ার বিশেষ আইনি সুযোগ রাখা হয়েছে।

 

বহু অভিভাবক তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ভ্রান্ত ধারণা অথবা ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে সন্তানদের টিকা প্রদান থেকে বিরত রাখছেন। ফলস্বরূপ, সমাজের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে শিশুরা, এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে এবং অত্যন্ত দ্রুত সংক্রমণের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং সমাজবিজ্ঞানীরা এই বিপজ্জনক প্রবণতার পেছনে সাম্প্রতিক বিশ্ব মহামারির মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির পর থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেকোনো প্রকার টিকা না নেওয়ার বা টিকাকে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইন্টারনেটের অবাধ প্রসারের ফলে টিকার কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অসংখ্য ভুয়া, ভিত্তিহীন ও অবৈজ্ঞানিক তথ্যের ছড়াছড়ি সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করছে।

 

বিজ্ঞান ও চিকিৎসকদের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা এবং অপতথ্যের অন্ধ অনুকরণই মূলত আজ যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক অনাকাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে, যা থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রচারণার কোনো বিকল্প নেই।

 

রয়টার্স