এর ফলে আইনি লড়াইয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শনিবার বোস্টনভিত্তিক প্রথম ইউএস সার্কিট কোর্ট অব অ্যাপিলস বিচারকদের ২-১ ভোটের ব্যবধানে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন খারিজ করে দেয়।
নিম্ন আদালতের দেওয়া একটি আইনি স্থগিতাদেশকে চ্যালেঞ্জ করে চলমান বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেই তা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়ার যে জরুরি অনুরোধ মার্কিন বিচার বিভাগ করেছিল, আপিল আদালত তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। এই আইনি পরাজয় আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
এর আগে গত ২৫ জুন মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জজ ইন্দিরা তালওয়ানি ট্রাম্পের আদেশের ওপর এই স্থগিতাদেশ জারি করেছিলেন। সেই সময় তার বিচারিক পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, গত মার্চ মাসে দেওয়া প্রেসিডেন্টের ওই নির্দেশিকার বেশ কয়েকটি অংশ সম্ভবত তার সাংবিধানিক ক্ষমতার আইনি সীমা অতিক্রম করেছে।
একই সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলো এবং মার্কিন কংগ্রেসের যে নিজস্ব ও স্বাধীন আইনি ক্ষমতা রয়েছে, ট্রাম্পের এই আদেশ সেখানে অন্যায্যভাবে হস্তক্ষেপ করছে বলে আদালত গভীরভাবে মনে করে।
ক্যালিফোর্নিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নেভাডা ও ওয়াশিংটনের মতো প্রভাবশালী ও ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যগুলোর নেতৃত্বে মোট ২৩টি অঙ্গরাজ্য এবং ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া যৌথভাবে এই নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নেমেছিল এবং মামলাটি দায়ের করেছিল।
তাদের মূল অভিযোগ ছিল, এই আদেশের মাধ্যমে ভোটারদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আদালতে শুনানিকালে মার্কিন বিচার বিভাগের আইনজীবীরা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। তারা দাবি করেন যে, এই নির্বাহী আদেশটি বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ফেডারেল সংস্থাগুলো এখনো তাদের যাবতীয় নীতিমালা চূড়ান্ত করেনি।
তাই মামলাটি নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই দায়ের করা হয়েছে এবং এটি এখনই বিচারযোগ্য নয়। তবে আপিল আদালত বিচার বিভাগের এই যুক্তি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে। আদালতের পর্যবেক্ষণে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়, যেহেতু আগামী সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অত্যন্ত ঘনিয়ে এসেছে, তাই অঙ্গরাজ্যগুলোকে এখনই সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণের সার্বিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
নির্বাহী আদেশে এমন কিছু কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার কারণে অঙ্গরাজ্যগুলোকে তড়িঘড়ি করে ফেডারেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে নতুন ভোটিং বিধি বাস্তবায়নের দিকে এগোতে হচ্ছিল। ফলে তারা নিজেদের নির্বাচনি কাঠামো ঠিক রাখতে এই আদেশের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হয়েছে।
এখন এই আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ বহাল থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন চাইলে বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত বা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে জরুরিভিত্তিতে আপিল করার সুযোগ পাচ্ছে। মূলত ফেডারেল নির্বাচন নীতি আরও কঠোর করার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই গত মার্চ মাসে এই বিতর্কিত নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ডাকযোগে ভোটিং পদ্ধতির চরম সমালোচনা করে আসছেন। এমনকি কোনো ধরনের সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই তিনি ধারাবাহিকভাবে দেশবাসীর কাছে এই দাবি করে যাচ্ছেন যে, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও জালিয়াতির কারণেই তাকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল।
নির্বাচন ব্যবস্থাকে কঠোর করার লক্ষ্যে তিনি একই সঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসকে ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ নামের একটি বিতর্কিত বিল পাস করার জন্যও প্রবল রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছেন। কিন্তু মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, দেশের যেকোনো ধরনের ফেডারেল নির্বাচন সুচারুভাবে পরিচালনার মূল দায়িত্ব এককভাবে অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপরই ন্যস্ত থাকে।
অন্যদিকে, কংগ্রেস কেবল সামগ্রিক নির্বাচনি প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট কিছু দিক নিয়ন্ত্রণের সাংবিধানিক ক্ষমতা রাখে, প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে তা চাপিয়ে দিতে পারেন না। বিচারক ইন্দিরা তালওয়ানি তার যুগান্তকারী রায়ে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, অঙ্গরাজ্যগুলোর নিজস্ব ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সাধারণ ভোটারদের নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত কোনো তালিকা তৈরি করার জন্য হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বাধ্য করার মতো আইনি ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের নেই।
তাছাড়া, ডাকযোগে ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক বিধি বা নিয়মকানুন আরোপ করার ক্ষমতাও মার্কিন ডাক বিভাগের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। ভোটার নিবন্ধনের জন্য নাগরিকত্বের আইনি বা লিখিত প্রমাণ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা এবং ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট গণনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপের লক্ষ্যে ট্রাম্পের দেওয়া অন্য একটি আদেশের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোও আদালত ইতোমধ্যেই স্থগিত করে রেখেছে।
আপিল আদালতের সর্বশেষ এই রায়ের ফলে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের বিতর্কিত ধারাগুলো আপাতত স্থগিতই থাকছে। এর চূড়ান্ত অর্থ হলো, মামলার বাদী ২৩টি অঙ্গরাজ্যে আসন্ন নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচন পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই কঠোর নিয়মগুলো কোনোভাবেই কার্যকর করা সম্ভব হবে না, যা মার্কিন নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় একটি বড় আইনি স্বস্তি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।