বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত এই বেবি পাউডার দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করার ফলে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন বলে দাবি করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অসংখ্য নারী।
দীর্ঘদিনের এই আইনি লড়াই, গ্রাহক অসন্তোষ ও বিতর্কের চূড়ান্ত অবসান ঘটাতে প্রতিষ্ঠানটি ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলার (যা ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য) ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে সমস্ত মামলা মেটাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে।
সোমবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পর্ষদ। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপটি জনসন অ্যান্ড জনসনের কর্পোরেট ইতিহাসের দীর্ঘকালীন ও সবচেয়ে জটিল আইনি সংকটের একটি বড় মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা কোম্পানিটির শেয়ার বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের এই জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, তাদের প্রস্তাবিত এই আর্থিক চুক্তিটি যদি আইনিভাবে সফলতার সাথে বাস্তবায়িত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল আদালতগুলোতে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা প্রায় ৬৯ হাজার মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটবে।
এই বিশাল সংখ্যক মামলা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে টেলক বা পাউডার সম্পর্কিত বকেয়া মামলাগুলোর প্রায় ৯৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। দশকের পর দশক ধরে চলা এসব মামলার জট খুলতে ৫৫০ কোটি ডলারের এই ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এই আইনি সমঝোতা চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার জন্য আদালতের পক্ষ থেকে একটি বড় শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অঙ্গরাজ্য বা ফেডারেল আদালতে যেসব নারী বা তাদের পরিবার ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা দায়ের করেছেন, তাদের অন্তত ৯৫ শতাংশের আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রয়োজন হবে এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য।
টেলক মূলত প্রকৃতিতে পাওয়া যায় এমন একটি অত্যন্ত নরম খনিজ পদার্থ, যা আর্দ্রতা শুষে নিতে দারুণ কার্যকর। একসময় প্রসাধন সামগ্রী তৈরি, বিশেষ করে শিশুদের ত্বকের সুরক্ষায় ব্যবহৃত বেবি পাউডারের মূল উপাদান হিসেবে এটি বিশ্বজুড়ে অভাবনীয় জনপ্রিয় ছিল।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মায়েরা তাদের নবজাতক শিশুদের জন্য এই পাউডারের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণায় এই খনিজ পদার্থটির সাথে মরণব্যাধি ক্যানসারের ঝুঁকির বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসার পর থেকে এর ব্যবহার ও চাহিদায় বড় ধরনের ধস নামে।
পরিস্থিতি আরও গুরুতর ও উদ্বেগজনক আকার ধারণ করে যখন ২০২৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও তাদের এক আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে টেলককে মানবদেহের জন্য 'সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী' উপাদানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই ঘোষণার পর থেকে জনসন অ্যান্ড জনসনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবল আন্তর্জাতিক তোপের মুখে পড়ে।
জনসন অ্যান্ড জনসনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকলেও, প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছে যে, তাদের ব্যবহৃত টেলক সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং এটি কোনোভাবেই ক্যানসারের কারণ নয়।
তাদের দাবি অনুযায়ী, টেলক ব্যবহারের ফলে ক্যানসার হয়-এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বা অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আজও মেলেনি। নিজেদের পণ্যের সুরক্ষার বিষয়ে তারা বারবার জনসমক্ষে সাফাই গাইলেও, জনরোষ, বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান আইনি জটিলতা এবং ক্রেতাদের আস্থার চরম সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত তারা বাজার থেকে পণ্যটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
আইনি বিতর্ক এড়াতে এবং ব্র্যান্ডের দীর্ঘদিনের সুনাম রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে তাদের আইকনিক টেলকভিত্তিক বেবি পাউডারের উৎপাদন ও বিক্রি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার এক কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
বর্তমানে তারা এর বিকল্প হিসেবে বিশ্বব্যাপী কর্নস্টার্চ বা ভুট্টার স্টার্চ ভিত্তিক সম্পূর্ণ নিরাপদ পাউডার বাজারজাত করছে। এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সূচনাটি বেশ পুরোনো এবং ঘটনাবহুল। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জুরি বোর্ড ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক নারীর পরিবারকে ৭ কোটি ২০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য জনসন অ্যান্ড জনসনকে নির্দেশ দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে টেলকম পাউডার ব্যবহারের কারণে ক্যানসারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এটিই ছিল প্রথম কোনো বিশাল অঙ্কের রায়, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যদিও পরবর্তী বছরে একটি উচ্চতর আদালত আপিলের ভিত্তিতে পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে ওই রায়টি বাতিল করে দেয়, কিন্তু ততদিনে মূল ক্ষতিটি হয়ে যায়।
এই রায়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের হিড়িক পড়ে যায় এবং অভিযোগকারীদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্যের জুরি বোর্ড বিভিন্ন আবেগঘন মামলায় বাদীদের অনুকূলে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ প্রদানের রায় বহাল রাখেন, যা প্রতিষ্ঠানটির জন্য বিশাল আর্থিক ও সম্মানহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নতুন এই বিশাল অঙ্কের সমঝোতা প্রস্তাবের বিষয়ে জনসন অ্যান্ড জনসনের লিটিগেশন বা মামলা পরিচালনা বিভাগের প্রধান এরিক হাস সংবাদমাধ্যমকে একটি আশাবাদী বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তাদের দীর্ঘদিনের জটিল, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল আইনি ঝামেলাগুলো চিরতরে পেছনে ফেলে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারবে এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে নিজেদের মূল লক্ষ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
অন্যদিকে, ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ভুক্তভোগীদের ও তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের পক্ষে লড়াই করা আইনজীবীরাও দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই ক্লান্তিকর আইনি লড়াই শেষে প্রস্তাবিত চুক্তিটিকে একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন।
তারা এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অন্তত কিছুটা আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবে এবং তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার মামলা এই ৫৫০ কোটি ডলারের বিশাল সমঝোতার আওতায় আসলেও, আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাজ্যের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই চুক্তিটি যুক্তরাজ্যের ঝুলে থাকা মামলাগুলোর জন্য কোনোভাবেই প্রযোজ্য হচ্ছে না বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের বিচারিক ইতিহাসে পণ্য দায়বদ্ধতার সবচেয়ে বড় মামলা হিসেবে সেখানে ৭ হাজারের বেশি সম্ভাব্য বাদী এখনো ন্যায়বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাজ্যে দায়ের করা এই চাঞ্চল্যকর মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, টেলকম পাউডার ব্যবহারের ফলে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার এবং মেসোথেলিওমা (ফুসফুস বা পেটের আবরণের এক ধরনের বিরল ক্যানসার) হতে পারে-এই সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা থাকা সত্ত্বেও জনসন অ্যান্ড জনসন দিনের পর দিন তাদের এই ক্ষতিকর পণ্যের বাজারজাতকরণ অব্যাহত রেখেছিল এবং গ্রাহকদের অন্ধকারে রেখেছিল।
তবে যুক্তরাজ্যের হাই কোর্টে বিচারাধীন এই গুরুতর অভিযোগগুলোকেও বরাবরের মতোই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে মার্কিন এই ফার্মা জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানটি।