মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কানাডায় বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলেন ১০ বাংলাদেশি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৬:০১ পিএম

কানাডায় বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলেন ১০ বাংলাদেশি
ছবি : Collected

সদ্য সমাপ্ত ফিফা বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর উন্মাদনার আড়ালে অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের এক নতুন ও কৌতূহলোদ্দীপক সমীকরণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামনে এসেছে। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসর মাঠে বসে উপভোগ করার উদ্দেশ্যে উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডায় ভ্রমণ করা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত ১৭৫ জন দর্শনার্থী সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে কানাডার সরকারি অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ইমিগ্রেশন, রিফ্যুজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা’ (আইআরসিসি) সম্প্রতি এই চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।

 

সংস্থাটির দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, উন্নত ও নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায় কানাডায় আশ্রয় চাওয়া এই বিদেশি নাগরিকদের তালিকায় ১০ জন বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্রীড়া আসরগুলোকে ব্যবহার করে উন্নত দেশগুলোতে অভিবাসনের এই প্রবণতা একেবারে নতুন না হলেও, এবারের বিশ্বকাপের বিশাল প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে বিশ্ব গণমাধ্যম ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

 

গত জুন ও জুলাই মাস জুড়ে কানাডার দুই অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম শহর টরন্টো এবং ভ্যানকুভারে ফিফা বিশ্বকাপের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১৩টি ম্যাচ জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। বৈশ্বিক এই ক্রীড়া মহোৎসব সরাসরি গ্যালারিতে বসে উপভোগ করার জন্য কানাডা সরকার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবলপ্রেমী দর্শকদের জন্য নিজেদের সীমান্ত অত্যন্ত উদারভাবে উন্মুক্ত করেছিল।

 

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা উপভোগ করার সুবিধার্থে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ২৬ হাজার ১১১ জন বিদেশি নাগরিককে সাময়িক দর্শনার্থী বা ভিজিটর ভিসা প্রদান করেছিল কানাডা প্রশাসন।

 

তবে বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা শেষ হওয়ার পর এই বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর একটি অংশ নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে কানাডার আইনি কাঠামোর আওতায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন করেছেন।

 

আইআরসিসির প্রকাশিত উপাত্তে গত ২০ জুলাই পর্যন্ত সর্বমোট ১৭৫ জনের আনুষ্ঠানিক আবেদনের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই আবেদনকারীদের মধ্যে বিশ্বকাপের মূল আসরে অংশগ্রহণকারী কোনো খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ বা দলের কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মকর্তা রয়েছেন কি না, সে বিষয়টি কানাডা সরকার এখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করেনি।

 

অভিবাসন বিশ্লেষকদের জোরালো ধারণা, আগামী দিনগুলোতে ভিসার আনুষ্ঠানিক মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যারা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দেশটিতে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, তাদের হিসাব যোগ করা হলে এই আশ্রয়প্রার্থী ও অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার এই বিস্তারিত পরিসংখ্যানে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একটি বৈচিত্র্যময় চিত্র সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্য নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা দিয়েছেন আফ্রিকার দেশ ঘানার নাগরিকরা।

 

ভিজিটর ভিসায় উৎসবমুখর পরিবেশে কানাডায় প্রবেশ করা ঘানার অন্তত ২৫ জন নাগরিক নিজ দেশে ফিরে না গিয়ে সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন। এই চাঞ্চল্যকর তালিকার দ্বিতীয় স্থানে যৌথভাবে অবস্থান করছে উত্তর আফ্রিকার দেশ মিসর এবং লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া।

 

এই দুটি দেশের ১৫ জন করে নাগরিক কানাডায় স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার জন্য সরকারের কাছে আইনি আবেদন করেছেন। এছাড়া, আফ্রিকার আরেক দেশ সেনেগালের ১০ জন এবং ইকুয়েডরের ৫ জন নাগরিকও নতুন করে নিজেদের ভবিষ্যৎ সাজানোর আশায় এই আশ্রয়প্রার্থীদের তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

 

সবচেয়ে বিস্ময়কর ও কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, যেসব দেশের জাতীয় ফুটবল দল ফিফা বিশ্বকাপের এই চূড়ান্ত আসরে অংশ নেওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি, সেসব দেশের ফুটবলপ্রেমী দর্শনার্থীরাও অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় দাবি করেছেন।

 

এই বিশেষ তালিকার পরিসংখ্যানও বেশ দীর্ঘ ও চিন্তার উদ্রেককারী। এর মধ্যে আফ্রিকার দেশ কেনিয়ার সর্বোচ্চ ১৫ জন নাগরিক রয়েছেন। এরপরই রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ, এশিয়ার পরাশক্তি চীন ও আফ্রিকার নাইজেরিয়া। এই তিনটি দেশের প্রত্যেকটি থেকে ১০ জন করে নাগরিক কানাডায় আইনি প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন।

 

এর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ নেপাল ও পাকিস্তান এবং আফ্রিকার দেশ বুরুন্ডি থেকে ৫ জন করে নাগরিক ঠিক একই পথ অনুসরণ করে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। খেলা দেখার নাম করে বৈধ ভিসা নিয়ে প্রবেশ করে পরবর্তীতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার এই সুপরিকল্পিত ঘটনাগুলো কানাডার ভবিষ্যৎ অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে।

 

আন্তর্জাতিক কোনো বৃহৎ ক্রীড়া আসরকে কেন্দ্র করে খেলোয়াড়, কর্মকর্তা বা দর্শকদের এমন দলবদ্ধ পলায়নের শঙ্কা বিশ্ব ক্রীড়া অঙ্গনে সম্পূর্ণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর বেশ কিছুদিন আগে বিদেশে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে নিজেদের খেলোয়াড়দের পালিয়ে যাওয়া এবং ভিনদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার প্রবল আশঙ্কায় আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার ফুটবল ফেডারেশন তাদের পুরুষ জাতীয় দলকে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব থেকেই অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।

 

খেলোয়াড়দের দেশত্যাগের সেই ভয়াবহ শঙ্কারই যেন এক বাস্তব ও বিস্তৃত প্রতিফলন এবার দেখা গেল সাধারণ ফুটবল দর্শকদের ক্ষেত্রে। কানাডা সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক, আইনি ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকে এই বিপুল সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীর আবেদনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা এবং তাদের আশ্রয় চাওয়ার পেছনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা।

 

আনাদোলু এজেন্সি