মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ সম্প্রসারণ

পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন রিপাবলিকান সিনেটররা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন রিপাবলিকান সিনেটররা
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি তা লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্তৃতি এবং কৌশলগত ব্যর্থতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন পরিচালনায় বর্তমান মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বা পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথের সক্ষমতা নিয়ে খোদ রিপাবলিকান সিনেটরদের মধ্যেই গভীর আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে।

 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য হিলের সাম্প্রতিক এক বিশদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, হেগসেথের অনভিজ্ঞতা এবং নীতিনির্ধারণী দুর্বলতার কারণে সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় মহলেই তার প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই পরিস্থিতিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা কাঠামোর জন্য এক বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, কারণ একটি চলমান আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে খোদ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওপর আস্থার অভাব সামগ্রিক সমরকৌশলকেই চরমভাবে দুর্বল করে দেয়।

 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতিতে যে সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতারা আগে থেকেই গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। দ্য হিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

জ্বালানির এই আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওই প্রণালিটি পুনরায় খুলে দিতে মার্কিন প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেছেন বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা।

 

তাদের মতে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দূরদর্শিতার অভাব ও দুর্বল পরিকল্পনার কারণেই এই অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত বিপর্যয় দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের উত্তাপ লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

 

এই সংঘাতের জেরে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরবের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতে সরাসরি হামলা চালানো শুরু করেছে। রিপাবলিকান নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশের মতে, লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর জলপথে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আগে থেকে অনুমান করতে মার্কিন গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

 

পেন্টাগনের এই কৌশলগত ব্যর্থতা মার্কিন প্রশাসনের জন্য এক অপ্রত্যাশিত এবং জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যার সম্পূর্ণ দায়ভার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপরই বর্তাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান এই ধমনী অবরুদ্ধ হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

 

এই শ্বাসরুদ্ধকর প্রেক্ষাপটে উত্তর ক্যারোলাইনার প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর টম টিলিস গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ্যে তার ক্ষোভ ও গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন। দ্য হিলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের ওপর তার আর বিন্দুমাত্র আস্থা অবশিষ্ট নেই।

 

সিনেটর টিলিসের মতে, হেগসেথ পেন্টাগনের মতো একটি বিশাল এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে একেবারেই অনভিজ্ঞ। তিনি অভিযোগ করেন যে, হেগসেথের অদূরদর্শী নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

 

বিশেষ করে, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তাকে তড়িঘড়ি করে অবসরে পাঠানো বা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

 

মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিরক্ষা নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকা একাধিক রিপাবলিকান সিনেটরও ইতিমধ্যে স্বীকার করেছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে পিট হেগসেথ অতি দ্রুত তার সমর্থন হারাচ্ছেন।

 

সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে মোতায়েনকৃত মার্কিন বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার ক্রিস ডোনাহুসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ও অত্যন্ত দক্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে জোরপূর্বক অবসরে বাধ্য করার যে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হেগসেথ নিয়েছেন, তা সামরিক বাহিনী এবং রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং অদূর ভবিষ্যতে কোনো দীর্ঘস্থায়ী ও সম্মানজনক শান্তিচুক্তির ন্যূনতম সম্ভাবনা দেখা না যাওয়ায় পেন্টাগন প্রধানের নেতৃত্ব নিয়ে এই আস্থার সংকট এখন চরমে পৌঁছেছে।

 

রাজনৈতিক ও সমর বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাথমিক পূর্বাভাসের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় রিপাবলিকান শিবিরের ভেতরে হতাশা ও অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। গত মার্চ মাসে ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছিলেন যে, এই সামরিক সংঘাত মাত্র চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের বেশি কোনোভাবেই স্থায়ী হবে না।

 

কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সেই হিসাবের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যাওয়ায় এখন খোদ ট্রাম্প প্রশাসনের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা নীতি নিয়েই দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠছে। রিপাবলিকান সিনেটররা ইতিমধ্যেই প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, হেগসেথের প্রতি এই ক্রমবর্ধমান অনাস্থার কারণে আগামী দিনে মার্কিন সামরিক বাজেট অনুমোদনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পছন্দের প্রক্রিয়ায় এই বিপুল পরিমাণ সামরিক বাজেট কংগ্রেসে পাস করানোর জন্য এখন খোদ রিপাবলিকান দলের ভেতরেই প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত সমর্থন নাও থাকতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

এর ফলে, আইনসভায় বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য ফিলিবাস্টার বা দীর্ঘায়িত বাধা প্রদান প্রক্রিয়া ভাঙার জন্য রিপাবলিকানদের বিশেষ ও জটিল সংসদীয় প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিতে হতে পারে, যা চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের জন্য এক বিরাট রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবেই বিবেচিত হবে।

 

- পার্সটুডে