তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যদি যুক্তরাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চুক্তি বাস্তবায়িত না হয়, তবে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
এমনকি মার্কিন সামরিক শক্তির মাধ্যমে মাত্র এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ইরানের অধিকাংশ সেতু ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব বলেও তিনি জোর দাবি করেছেন। মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএনের প্রচারিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বিতর্কিত ও চরম আক্রমণাত্মক বক্তব্যের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর আগে ওই দিন সকালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এ দেওয়া এক বিশেষ টেলিকনফারেন্স সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজের এই ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনার কথা খোলামেলাভাবে ব্যক্ত করেন।
সাক্ষাৎকার চলাকালীন ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় তারা যদি শেষ পর্যন্ত কোনো সর্বজনগ্রাহ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে তিনি তার অসম্পূর্ণ সামরিক কাজ শেষ করতে আবার পূর্ণ শক্তিতে ফিরে আসবেন।
তিনি আরও যোগ করেন, মার্কিন হামলার পর ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত সেইসব বিশাল অবকাঠামো পুনর্গঠন করা দেশটির জন্য অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হবে। ইতোমধ্যে অতীতের সংঘাতের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতেই তাদের বহু বছর লেগে যাবে, আর নতুন করে কোনো বড় ধরনের আঘাত এলে তেহরানের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
নিজের বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও দাবি করেন যে, বিশ্বের বহু প্রভাবশালী কূটনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞ তাকে এই অসম্পূর্ণ সামরিক অভিযান শেষ করার জন্য ক্রমাগত তাগিদ ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মাধ্যম সেতুর প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক সামরিক সক্ষমতা প্রয়োগ করে ইরানের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সেতু মাত্র এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেওয়া সম্ভব।
কেবল পরিবহন খাতই নয়, বরং ইরানের জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ খাতকেও তাদের সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বার্তা দেন তিনি। ট্রাম্পের মতে, কোনো দেশের অর্থনৈতিক ও নাগরিক ব্যবস্থার জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলো সবচেয়ে জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রকৌশলগত বিষয়, আর একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দিতে সেতু পুনর্নির্মাণে সবচেয়ে বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়।
তাই এই দুই কৌশলগত খাতে আঘাত হানলে প্রতিপক্ষ দেশ আন্তর্জাতিকভাবে চরম ব্যাকফুটে চলে যাবে। তবে কঠোর আক্রমণাত্মক সামরিক হুমকির পাশাপাশি নিজের বক্তব্যে কিছুটা মানবিক ও কৌশলগত ভারসাম্যের সুরও বাজাতে দেখা গেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে।
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ইরানের সমুদ্রের লোনা পানি পরিশোধন করে সুপেয় পানিতে রূপান্তরকারী ‘ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট’ বা পানি শোধন কেন্দ্রগুলোতে তিনি কোনো অবস্থাতেই হামলা চালাতে চান না।
এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্পর্শকাতর অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ না করার পেছনে নিজের যুক্তি উপস্থাপন করে ট্রাম্প বলেন, সুপেয় পানির প্ল্যান্ট ধ্বংস করলে সরাসরি ইরানের সাধারণ ও নিরীহ বেসামরিক জনগণই সবচেয়ে বেশি চরম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।
তিনি ব্যক্তিগতভাবে বা মার্কিন নীতিগত দিক থেকে সাধারণ জনগণকে সরাসরি কষ্ট দিতে চান না বলেই এই মানবিক ছাড় দেওয়ার কথা ব্যক্ত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যবর্তী তীব্র সামরিক ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল পুনরায় সচল করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা বজায় রাখা, অন্যদিকে একই সঙ্গে দেশের মূল অবকাঠামো ধূলিসাৎ করে দেওয়ার সরাসরি হুমকি প্রদর্শন-ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী কৌশলকে অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইরানের ওপর চরম মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তবে এই ধরনের চরম উসকানিমূলক মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের আগে থেকেই ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে নতুন করে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।