শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্রে হামলা ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০২:৩২ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্রে হামলা ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি
ছবি : Collected

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিগত এক বছরে মসজিদ এবং ইসলামি কেন্দ্রগুলোতে হামলা, ভাঙচুর ও বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রে এমন অসহিষ্ণুতা ও ঘৃণামূলক অপরাধের বিস্তার সাধারণ মানুষের মনে গভীর শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের তুলনায় চলতি বছর ঠিক একই সময়ে দেশটিতে মসজিদ ও মুসলিম উপাসনালয় লক্ষ্য করে চালানো হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ৫১ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

এই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মার্কিন সমাজে বসবাসরত সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিয়ে নতুন করে জোরালো প্রশ্ন তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা বিষয়ক শীর্ষস্থানীয় সংস্থা ‘দ্য কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স’ বা কেয়ার সম্প্রতি তাদের এক বিস্তারিত ও সুগভীর প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরেছে।

 

ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টতই বলা হয়েছে যে, সামগ্রিক বৃদ্ধির পাশাপাশি বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে এই বিদ্বেষমূলক অপরাধের মাত্রা ছিল আরও বেশি ভয়াবহ। পরিসংখ্যান বলছে, সর্বশেষ তিন মাস, অর্থাৎ ২০২৬ সালের মে, জুন এবং জুলাই মাসে মসজিদ ভাঙচুর ও হামলার ঘটনাগুলো গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ঠিক একই সময়ের তুলনায় শতকরা ১৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

কেয়ার-এর এই প্রতিবেদনে কেবল সাধারণ ভাঙচুর বা সম্পত্তি নষ্টের ঘটনাকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি; বরং মসজিদ লক্ষ্য করে চরম সহিংসতা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অগ্নিসংযোগ, মুসল্লিদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং আইনি বৈধতা থাকা সত্ত্বেও নতুন মসজিদ নির্মাণে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধগুলোকেও একই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

 

এই ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ ও সহিংসতার সবচেয়ে করুণ, মর্মান্তিক এবং প্রাণঘাতী উদাহরণটি দেখা যায় গত ১৮ মে। ওই দিন ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগো শহরের একটি ইসলামিক সেন্টারে একদল শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থি অতর্কিত ও বর্বরোচিত হামলা চালায়। উপাসনালয়ের মতো একটি পবিত্র ও শান্তিপূর্ণ স্থানে এমন সশস্ত্র হামলা পুরো জাতিকে হতবাক করে দেয়।

 

সেই সময় ইসলামিক সেন্টারে থাকা নিরীহ শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের অমূল্য জীবন উৎসর্গ করেন আমিন আবদুল্লাহ, মনসুর কাজিহা এবং নাদির আওয়াদ নামের তিন সাহসী ব্যক্তি। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি কেবল মুসলিম সম্প্রদায়কেই নয়, বরং গোটা যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিকামী মানুষকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে।

 

চরমপন্থিদের এই নিষ্ঠুরতা প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় বিদ্বেষ কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে এবং তা কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে। এই সামগ্রিক ভীতিকর পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে কেয়ার-এর গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি শাখার পরিচালক কোরি সেইলর গভীর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

 

তিনি এক বিশেষ বার্তায় জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামভীতি এবং ঘৃণা প্রদর্শন যেন সমাজের একটি বৃহৎ অংশে এক ধরনের অঘোষিত গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেছে, যা যেকোনো সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি প্রবণতা।

 

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সমাজের এই অবক্ষয়ের প্রভাব কেবল মুসলমানদের ওপরই পড়ছে না; মসজিদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়েও নিয়মিত ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে, যদিও পরিসংখ্যানে তার মাত্রা মুসলিম সম্প্রদায়ের তুলনায় অনেকটাই কম।

 

এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি নিরসনে কোরি সেইলর কমিউনিটি বা সমাজপতিদের নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, ইসলামভীতি ও ঘৃণামূলক অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আরও বেশি দায়িত্বশীল, সোচ্চার ও সতর্ক হতে হবে।

 

সাধারণত মুসলিম বিদ্বেষ সংক্রান্ত কোনো গুরুতর ঘটনা ঘটলে কেয়ার পরবর্তী তিন মাস ধরে ওই নির্দিষ্ট এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকে। সমাজে উত্তেজনা বাড়ছে কি না, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং প্রশাসন যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে কি না, তা মূল্যায়নের উদ্দেশ্যেই মূলত এই দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

 

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেয়ার-এর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, তাদের সংরক্ষিত আনুষ্ঠানিক রেকর্ড অনুযায়ী, গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরো এক বছরে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ সংক্রান্ত মোট ৩৩টি ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছিল। অথচ চলতি বছরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ভীতিকর।

 

কেবল মে থেকে জুলাই-এই তিন মাসের স্বল্প ব্যবধানেই দেশটিতে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ ঘটেছে ১৭টি। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর সূত্রে প্রাপ্ত এই তথ্যগুলো নিঃসন্দেহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি উন্নত রাষ্ট্রে সামাজিক সম্প্রীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড় ধরনের অশনিসংকেত দিচ্ছে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি