শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আর্জেন্টিনায় ভয়াবহ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত ৭ জন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪৫ এএম

আর্জেন্টিনায় ভয়াবহ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত ৭ জন
ছবি : Collected

ল্যাটিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ সান জুয়ানে এক মর্মান্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সাতজন প্রাণ হারিয়েছেন। একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করতে গিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করলেন এই সাহসী মানুষেরা।

 

বুধবার স্থানীয় সময় সকালের দিকে সান জুয়ান প্রদেশের সুপরিচিত ইশ্চিগুয়েলাস্তো ন্যাচারাল পার্কের কাছাকাছি দুর্গম এলাকায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, নিহতরা সবাই পেশাদার এবং বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত দমকলকর্মী ছিলেন, যারা পার্শ্ববর্তী একটি প্রদেশের ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন।

 

মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনাটি গোটা আর্জেন্টিনায় গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে এবং একইসাথে পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভয়াবহতা নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় সান জুয়ানের প্রাদেশিক গভর্নর মার্সেলো ওররেগো এই দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি জানান, বিধ্বস্ত হওয়া আকাশযানটি ছিল একটি ‘বেল ৪১২’ মডেলের অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার। মূলত পার্শ্ববর্তী প্রদেশ লা রিওজায় গত কয়েকদিন ধরে চলা বিধ্বংসী দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে সান জুয়ানের প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ও জরুরি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

 

সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই অগ্নিনির্বাপণে বিশেষভাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত দমকলকর্মীদের একটি দল পাঠানো হচ্ছিল সেখানে। দুর্ভাগ্যবশত, উদ্ধারকারী ও অগ্নিনির্বাপক দলের সেই প্রথম বহরটিই মাঝপথে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়, যা উদ্ধারকাজের প্রস্তুতিকে এক বিশাল ধাক্কা দিয়েছে।

 

প্রাদেশিক প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, সান জুয়ান থেকে উড্ডয়নের পর বেশ কিছুক্ষণ স্বাভাবিকভাবেই এগোচ্ছিল হেলিকপ্টারটি। কিন্তু স্থানীয় সময় সকাল দশটা বেজে ত্রিশ মিনিটের দিকে কন্ট্রোল রুমের সাথে আকাশযানটির রেডিও যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

 

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঠিক পরপরই ইশ্চিগুয়েলাস্তো ন্যাচারাল পার্কের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চলের কোনো এক স্থানে সেটি সজোরে আছড়ে পড়ে বলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিক ধারণা করছেন।

 

এই প্রাকৃতিক উদ্যানটি এমনিতেই বেশ দুর্গম এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে বৈচিত্র্যময়, যার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ওই অঞ্চলে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন স্থানীয় সংবাদকর্মী মাউরিসিও দাভিলা।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দুর্ঘটনাস্থলের এক ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “বিধ্বস্ত হওয়ার পর সম্পূর্ণ হেলিকপ্টারটি আক্ষরিক অর্থেই টুকরো টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে।

 

এটি সত্যিই অত্যন্ত ভয়াবহ এবং অকল্পনীয় একটি দুর্ঘটনা। ধ্বংসস্তূপের যে ভয়াবহ অবস্থা, তাতে সেখানে থাকা কোনো যাত্রীর বেঁচে থাকার ন্যূনতম কোনো সম্ভাবনা নেই।” তার এই সরেজমিন বর্ণনার পর উদ্ধারকারী দলও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে যে, আকাশযানটিতে থাকা সাতজন আরোহীর কেউই আর জীবিত নেই।

 

কী কারণে এমন একটি অত্যাধুনিক এবং সুরক্ষিত হেলিকপ্টার হঠাৎ বিধ্বস্ত হলো, তা নিয়ে ইতোমধ্যে নানা মহলে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দুর্ঘটনার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রতিকূল আবহাওয়া নাকি পাইলটের কোনো ভুল-ঠিক কোনটি এই দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী, তা খতিয়ে দেখতে সান জুয়ানের প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

এই কমিটি খুব শিগগিরই দুর্ঘটনাস্থল থেকে যাবতীয় আলামত সংগ্রহ করে তাদের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এদিকে, নিজেদের জীবন বাজি রেখে অন্যের জীবন ও সম্পদ বাঁচাতে যাওয়া এই বীর দমকলকর্মীদের মৃত্যুতে সান জুয়ান প্রদেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।

 

এই তিন দিন প্রদেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। প্রদেশের গভর্নর মার্সেলো ওররেগো এবং আর্জেন্টিনার কেন্দ্রীয় সরকারের নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী আলেজান্দ্রা মন্তেওলিভা এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও শোক জ্ঞাপন করেছেন।

 

তারা জানিয়েছেন, নিহতদের পরিবার যেন এই অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে, সেজন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে। এই দুর্ঘটনার পেছনের মূল কারণ হিসেবে যে দাবানলের কথা বলা হচ্ছে, সেই লা রিওজা প্রদেশের পরিস্থিতিও বর্তমানে অত্যন্ত ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

 

ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে লা রিওজা প্রদেশটি মধ্য ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়ার প্রায় সমান। বিশাল এই প্রদেশের বনাঞ্চলে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে একটানা দাবানল জ্বলছে। বিরূপ আবহাওয়া এবং শুষ্ক বাতাসের কারণে আগুন দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে।

 

ইতোমধ্যেই হাজার হাজার হেক্টর জমির মূল্যবান গাছপালা, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং কৃষকদের ফসল এই বিধ্বংসী দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় দমকল বাহিনীর পাশাপাশি অন্যান্য প্রদেশ থেকেও জরুরি সাহায্য চাওয়া হয়েছিল।

 

সেই ডাকে সাড়া দিতে গিয়েই সান জুয়ানের এই সাতজন সাহসী সন্তানকে অকালে প্রাণ হারাতে হলো, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হচ্ছে।

 

- এএফপি