শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রাজিলে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের অনুমোদন স্থগিত, চরম ক্ষুব্ধ ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম

ব্রাজিলে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের অনুমোদন স্থগিত, চরম ক্ষুব্ধ ট্রাম্প
ছবি : Collected

পশ্চিমা বিশ্বের বৃহত্তম দুই গণতান্ত্রিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ব্রাজিলে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক অনুমোদন আটকে রেখেছে ব্রাসিলিয়া।

 

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই সিদ্ধান্তহীনতা ও বিলম্বের কারণে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, আগামী অক্টোবরে ব্রাজিলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

 

কিন্তু বর্তমান এই কূটনৈতিক বিরোধের কারণে নির্বাচনের আগে ব্রাসিলিয়ায় হয়তো ওয়াশিংটনের কোনো রাষ্ট্রদূত থাকবেন না। এই পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে পড়তে শুরু করেছে এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে।

 

কূটনৈতিক এই টানাপোড়েনের সূত্রপাত ঘটে গত ১ জুন, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিয়োর ঘনিষ্ঠ মিত্র ড্যানিয়েল পেরেজকে ব্রাজিলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত করেন।

 

কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রদূত নিয়োগের আগে স্বাগতিক দেশের পূর্বানুমোদন বা সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘আগ্রেমো’ নামে পরিচিত। কিন্তু বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ব্রাজিলের আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়ার আগেই পেরেজকে মনোনীত করা হয়েছে।

 

ব্রাসিলিয়ার একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, প্রচলিত এই কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন বা পূর্বানুমতি না নেওয়ার বিষয়টিকে ব্রাজিল সরকার অত্যন্ত অবমাননাকর বলে মনে করছে।

 

পেরেজের এই মনোনয়ন বর্তমানে মার্কিন সিনেটে চূড়ান্ত ভোটাভুটির অপেক্ষায় রয়েছে, তবে ব্রাজিলের আনুষ্ঠানিক সবুজ সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত তিনি কোনোভাবেই নিজের পদে যোগ দিতে পারবেন না।

 

ব্রাজিল সরকারের এই ধীরগতির নীতিকে মার্কিন কর্মকর্তারা মোটেও ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না। মার্কিন প্রশাসনের দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই বিলম্বের কারণে চরম ক্ষুব্ধ।

 

চলতি সপ্তাহের মধ্যে এই কূটনৈতিক জটিলতার কোনো সন্তোষজনক সমাধান না হলে ওয়াশিংটন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। বিলম্বের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বিশ্বে কারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা নির্ধারণ করার পূর্ণ অধিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রয়েছে।

 

তিনি তাঁর প্রশাসনের জন্য ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে আমেরিকা’ নীতির ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক দল গঠন করছেন। মার্কিন অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের যেকোনো অপচেষ্টাকে তারা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

 

অন্যদিকে, ব্রাজিলের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কূটনৈতিক রীতিনীতি মেনেই পেরেজের বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত পরিচালনা করছে তাদের সরকার। তাদের একজন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী ৪ অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে পেরেজ হয়তো এই আগ্রেমো বা অনুমোদন পাবেন না।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, অনুমোদন দেওয়া হবে না এমন কথা তারা বলছেন না, তবে এর জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত নেই এবং উপযুক্ত সময় কখন আসবে, তা নির্ধারণের নিরঙ্কুশ এখতিয়ার কেবল স্বাগতিক দেশেরই রয়েছে।

 

এই স্পর্শকাতর বিষয়ে ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভিয়েনা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির নীতিমালা অনুযায়ী সমগ্র প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ গোপনীয়তার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তারা কোনো মন্তব্য করবে না।

 

মূলত ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার প্রশাসনের সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিয়ো এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরেই বেশ উত্তপ্ত। লুলার প্রশাসন অভিযোগ তুলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকার রাজনীতিকে রক্ষণশীলদের পক্ষে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

 

বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, ব্রাজিলের বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় রক্ষণশীলদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেন্সর করা হচ্ছে বা তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে লুলা দ্য সিলভা তার চতুর্থ মেয়াদের জন্য লড়ছেন, যেখানে তার প্রধান স্লোগান হলো ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব’।

 

তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো, যিনি নিজেকে ট্রাম্পের প্রধান মিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। সম্পর্কের এই অবনতির মধ্যেই গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ব্রাজিলের দুটি অপরাধী গোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

 

এর পাশাপাশি অসাধু বাণিজ্য নীতির অভিযোগ তুলে চলতি মাসে ব্রাজিলের বেশ কিছু পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন এবং পরবর্তীতে জোরপূর্বক শ্রমের উদ্বেগের কথা জানিয়ে আরও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া হয়।

 

এর জবাবে ট্রাম্প প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা যখন ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশটিতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন, তখন ব্রাজিল সরকার তাদের ভিসার আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। এসব বিষয় দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

সিনেটের শুনানিতে ড্যানিয়েল পেরেজ অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি অনুমোদন পেলে ব্রাজিলের আগামী নির্বাচনই হবে তার প্রথম অগ্রাধিকার এবং দেশটিতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাবে।

 

- রয়টার্স