শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে বড় বাধা অস্ত্রের ঘাটতি!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে বড় বাধা অস্ত্রের ঘাটতি!
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বর্তমানে এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক অভিযান এক নতুন এবং অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

 

আধুনিক সমরাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শক্তি হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে মারাত্মক গোলাবারুদ এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে।

 

এই অপ্রত্যাশিত সরবরাহ সংকট ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন সামরিক কৌশল ও সার্বিক অভিযানের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্তাব্যক্তিরা যুদ্ধক্ষেত্রের এই কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টি অনুধাবন করে ইতোমধ্যে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সতর্ক করার জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

 

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বা এপি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই স্পর্শকাতর তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।

 

ওই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের বর্তমান চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পেন্টাগনের এই ক্রমবর্ধমান অস্ত্র সংকটের বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন।

 

তিনি প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছেন যে, সংঘাতের মাত্রা যদি আরও বৃদ্ধি পায় বা এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জামের এই ঘাটতি মার্কিন বাহিনীর আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।

 

যুদ্ধক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখা যেকোনো সামরিক বাহিনীর জন্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, আর বর্তমান বৈরী পরিস্থিতিতে পেন্টাগন ঠিক সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় হোঁচট খাচ্ছে বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনভিত্তিক স্বনামধন্য ও প্রভাবশালী নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ বা সিএসআইএস-এর সাম্প্রতিক এক বিশদ বিশ্লেষণেও পেন্টাগনের এই অস্ত্র ঘাটতির অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্রটি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

 

প্রতিষ্ঠানটির সামরিক বিশেষজ্ঞরা তাদের নিবিড় গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই আমেরিকার অস্ত্রভাণ্ডারে থাকা অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর মজুত অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিঃশেষ হয়ে আসছে।

 

বিশেষ করে শত্রুর যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট এবং থাড ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ইতোমধ্যে অত্যন্ত বিপজ্জনক স্তরে নেমে এসেছে।

 

এই দুটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা সদস্য এবং তাদের কৌশলগত মিত্রদের সুরক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাথমিক বর্ম হিসেবে কাজ করে থাকে। সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, আধুনিক সমরাস্ত্রের এই ঘাটতি রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

 

ইরানের মতো একটি শক্তিশালী, সামরিকভাবে প্রস্তুত এবং উন্নত ড্রোন প্রযুক্তিসম্পন্ন দেশের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যে বিপুল পরিমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের অবিরাম সরবরাহ প্রয়োজন, তা তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন করা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রতিরক্ষা শিল্প কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় অসম্ভব।

 

ফুরিয়ে যাওয়া এই বহুমূল্য থাড এবং প্যাট্রিয়ট প্যাক-থ্রি ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মজুত পুনরায় পূর্ণ করতে মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে বর্তমানের এই জরুরি ও তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে না পারলে রণক্ষেত্রে মার্কিন আধিপত্য চরম হুমকির মুখে পড়বে।

 

সিএসআইএস-এর ওই বিশ্লেষণে সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই বহুমুখী সংঘাত ও চরম যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি কোনো কারণে দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে অত্যাধুনিক অস্ত্রের এই চরম ঘাটতি ওই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিয়োজিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জীবনকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে।

 

একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কৌশলগত সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন হামলার মারাত্মক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।

 

যখন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরগুলো পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে, তখন শত্রুর যেকোনো সাধারণ মাত্রার আক্রমণও মার্কিন বাহিনীর জন্য এক বিশাল সামরিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

 

সার্বিকভাবে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মার্কিন সমরাস্ত্রের এই সরবরাহ সংকট একটি বড় ধরনের কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে উন্মোচিত হয়েছে।

 

একদিকে আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত সম্প্রসারণের প্রবল আশঙ্কা এবং অন্যদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসার এই দ্বিমুখী সংকট মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সামনে এক কঠিন পরীক্ষার জন্ম দিয়েছে।

 

এই পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আধুনিক সমরাস্ত্রের দম্ভ থাকলেও সরবরাহ শৃঙ্খল ও মজুত সক্ষমতার রূঢ় বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতে জয়লাভ করা অত্যন্ত কঠিন। এখন দেখার বিষয়, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই চরম সতর্কবার্তার পর মার্কিন প্রশাসন তাদের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলে নতুন কী ধরনের পরিবর্তন আনে।

 

- মিডল ইস্ট আই