মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষে বিদেশি স্নাতকদের কাজের সুযোগ পেতে এখন থেকে গুনতে হতে পারে বিশাল অঙ্কের অর্থ। বিদেশি শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা শেষ করে সেখানে চাকরি করতে চাইলে তাদের ওপর এক লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক কোটি বাইশ লাখ টাকার সমপরিমাণ, ফি আরোপের কথা ভাবছে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে মার্কিন প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রস্তাবিত সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের বাজারে ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নীতি বিশ্লেষকরা।
জানা গেছে, এই প্রস্তাবিত বিশাল অঙ্কের ফি মূলত ‘অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং’ বা ওপিটি কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রচলিত মার্কিন অভিবাসন নিয়ম অনুযায়ী, ওপিটি সুবিধার আওতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সফলভাবে সম্পন্ন করার পর তাদের বিদ্যমান শিক্ষার্থী ভিসাতেই এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত সে দেশে অবস্থান করে পেশাগত কাজ করার বৈধ সুযোগ পেয়ে থাকেন।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়গুলোতে উত্তীর্ণরা সাধারণত বেশি সময়ের জন্য এই সুযোগ পান। মার্কিন প্রশাসনের সর্বশেষ ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় চার লাখ উনিশ হাজার বিদেশি নাগরিক এই ওপিটি কর্মসূচির অধীনে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ছিলেন।
নতুন প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হলে এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেমন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, তেমনি নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীদের প্রবণতাও ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বৈধ অভিবাসন সীমিত করার যে পূর্বঘোষিত কঠোর নীতি রয়েছে, আলোচিত এই পরিকল্পনাটি তারই একটি ধারাবাহিক ও জোরালো পদক্ষেপ।
তবে এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব কেবল আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়বে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনীতি ও বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত আধিপত্যেও এর গভীর প্রভাব অনুভূত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের দেওয়া টিউশন ফির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক খাতের শীর্ষ কোম্পানিগুলো তাদের মেধা ও সৃজনশীলতার চাহিদার একটি বড় অংশ মেটায় এই বিদেশি স্নাতকদের দিয়ে। ওপিটি কর্মসূচিতে এত বিশাল অঙ্কের ফি আরোপিত হলে কোম্পানিগুলোর জন্য বিদেশি মেধা নিয়োগের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
উল্লেখ্য যে, অভিবাসীদের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক শর্ত আরোপের এই চেষ্টা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একেবারে নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর ঠিক আগে বিদেশি পেশাজীবীদের জন্য বহুল কাঙ্ক্ষিত এইচ-ওয়ানবি ভিসার ক্ষেত্রেও ঠিক এক লাখ ডলার ফি আরোপের একটি অনুরূপ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
তবে আইনি বাধার কারণে সেই উদ্যোগটি আপাতত থমকে আছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের একটি আপিল আদালত এক আদেশের মাধ্যমে ওই ফি আদায়ের প্রক্রিয়াটি স্থগিত করে দিয়েছেন।
বিচার বিভাগের কাছ থেকে এইচ-ওয়ানবি ভিসায় বাধা পাওয়ার পরই মূলত মার্কিন প্রশাসন ওপিটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এই নতুন ফি আরোপের প্রস্তাবটি সামনে নিয়ে এসেছে বলে একাধিক সূত্র গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক দপ্তর বা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) অভ্যন্তরে এই নতুন প্রস্তাবটি নিয়ে বর্তমানে গভীর আলোচনা ও পর্যালোচনা চলছে। তবে শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউস এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেবে কি না, তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট সংশয় ও ধোঁয়াশা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ শেষ পর্যন্ত কে পরিশোধ করবে। এটি কি সদ্য পাস করা চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হবে, নাকি তাকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান অথবা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই বিশাল ব্যয় বহন করবে-সেই বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি মার্কিন প্রশাসন।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক মুখপাত্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত কোনো নীতিকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তারা আরও জানিয়েছে যে, মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে সম্ভাব্য বিভিন্ন নীতি নিয়ে তাদের দপ্তরে নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা চলমান রয়েছে।
বিশাল অঙ্কের এই ফি আরোপের পরিকল্পনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিমধ্যে আরও কিছু নতুন ও কঠোর শর্ত ঘোষণা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ওপিটি সুবিধা উপভোগ করতে চাইলে শিক্ষার্থী ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য এখন থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে।
এর আগে নিয়মটি শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ সহজ ও সাবলীল ছিল; কারণ শিক্ষার্থীদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাদের মূল শিক্ষাকাল এবং অতিরিক্ত সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কর্ম-অনুমোদনের সময়সীমা পর্যন্ত বৈধ বলে গণ্য হতো।
এছাড়া, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ দীর্ঘদিনের পুরোনো ওপিটি কর্মসূচির পুরো নিয়মকানুন নতুন করে লেখার জন্য একটি বিস্তৃত ও কঠোর নীতিমালা প্রস্তুত করছে, যা চলতি বছরের শরৎকালেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক প্রসারে ওপিটি কর্মসূচির ভূমিকা অনস্বীকার্য। উদারনৈতিক বিশ্লেষক ও মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের মতে, মেধা বিকাশের এই সুযোগ বন্ধ হলে বা সংকুচিত হলে মেধার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়বে।
বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের মতো অন্যান্য দেশের শ্রমবাজারে কাজে লাগাবে। অন্যদিকে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও সীমিতকরণের পক্ষের কট্টরপন্থিদের যুক্তি হলো, ওপিটি কর্মসূচির মাধ্যমে সস্তায় বিদেশি স্নাতক নিয়োগের ফলে খোদ মার্কিন নাগরিকদেরই ভালো চাকরির সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে এবং তাদের গড় মজুরি কমে যাচ্ছে। তাদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগ দেশীয় কর্মীদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে।