শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ও বার্থ ট্যুরিজম সীমিত করার লক্ষ্যে ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ও বার্থ ট্যুরিজম সীমিত করার লক্ষ্যে ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশ
ছবি : Collected

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে আরও একবার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ইস্যু জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব এবং তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে দুটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন।

 

এর আগে একই ধরনের একটি উদ্যোগ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে গিয়েছিল। তবে আগের আইনি পরাজয় সত্ত্বেও নিজের কঠোর অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নে অনড় ট্রাম্প এবার ভিন্ন কৌশলে নতুন এই আদেশগুলো প্রণয়ন করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপ দেশটিতে বসবাসরত অভিবাসী এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে ইচ্ছুক লাখো মানুষের মধ্যে নতুন করে গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।

 

হোয়াইট হাউসে সদ্য স্বাক্ষরিত প্রথম নির্বাহী আদেশটির মূল লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক অধিকারকে সংকুচিত করা। নতুন এই নির্দেশনার আওতায় বেশ কিছু জটিল শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

 

এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যদি নবজাতকের বাবা ও মা উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক না হন এবং তাদের মধ্যে অন্তত একজন বিদেশি কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, বিদেশি সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকেন, অথবা মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার প্রতারণার আশ্রয় নেন, তবে সেই শিশু জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

 

পাশাপাশি, যেসব মার্কিন ভূখণ্ডে ফেডারেল আইনের অধীনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি নেই, সেখানে বসবাসকারী অ-নাগরিকদের ক্ষেত্রেও এই একই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে। হোয়াইট হাউসে এই আদেশে স্বাক্ষর করার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, এই পরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক আগেই কার্যকর হওয়া উচিত ছিল।

 

এ সময় তিনি জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তাঁর আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের তীব্র সমালোচনাও করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জারি করা দ্বিতীয় নির্বাহী আদেশের মূল লক্ষ্য হলো ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা সন্তান জন্মদানের জন্য পর্যটক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসার প্রবণতা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা।

 

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু বিদেশি নাগরিক কেবল পর্যটন ভিসার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন, যেন তাদের অনাগত সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্মগ্রহণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করতে পারে।

 

হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ক উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুরা কোনো কারণ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত নানা অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা অন্যায্যভাবে ভোগ করার সুযোগ পায়।

 

তাঁর মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের বিদ্যমান অভিবাসন আইনের কাঠামোর ভেতরে থেকেই জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় এমন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সম্পূর্ণ আইনি ক্ষমতা রাখেন। তবে বার্থ ট্যুরিজমের পরিসংখ্যান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবির সঙ্গে বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি তথ্যের ব্যাপক অমিল রয়েছে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, বার্থ ট্যুরিজমের সুযোগ নিয়ে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক লাখ শিশুর জন্ম হচ্ছে। কিন্তু নির্দলীয় ও স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইমিগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।

 

তাদের মতে, প্রতি বছর পর্যটক ভিসায় এসে যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্মদানের ঘটনা ঘটে বড়জোর ২২ হাজার থেকে ২৬ হাজারের মতো। এর পাশাপাশি, মার্কিন সরকারের নিজস্ব পরিসংখ্যানও ট্রাম্পের দাবিকে পুরোপুরি সমর্থন করে না।

 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশি ঠিকানাসম্পন্ন মায়েদের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল মাত্র নয় হাজার ৬০০ জন। এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে, বার্থ ট্যুরিজম সমস্যাটিকে যতটা বড় করে দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে এর পরিধি অনেক ক্ষুদ্র।

 

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্দেশ্যে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু সেই পদক্ষেপটি দ্রুতই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

 

পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে জানিয়ে দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী অনুযায়ী জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার একটি অলঙ্ঘনীয় সাংবিধানিক অধিকার, যা কোনো সাধারণ নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাতিল করা সম্ভব নয়। আইন বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের বর্তমান পদক্ষেপ নিয়েও যথেষ্ট সন্দিহান।

 

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিস আইনবিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল চিন এই প্রসঙ্গে বলেন, বিদেশিদের বার্থ ট্যুরিজম ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভিসা নীতিতে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করার ক্ষমতা রাখেন।

 

কিন্তু জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের যে মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার সংবিধানে সুরক্ষিত রয়েছে, তা কোনো নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে পরিবর্তন বা বাতিল করার এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের নেই। তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর জন্ম নেওয়া মোট শিশুর সংখ্যার তুলনায় বার্থ ট্যুরিজমের ঘটনা এতটাই নগণ্য যে, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো বড় ধরনের হুমকি নয়।

 

- ইত্তেফাক