বর্তমানে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে এই নৌপথে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের হার বিগত এক সপ্তাহের মধ্যে একেবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এমন একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার এই দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। মূলত, এই প্রণালীটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল করিডোর, যা বর্তমানে যুদ্ধাবস্থার কারণে প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
বুধবার নিজের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ প্রকাশিত একটি দীর্ঘ বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বিষয়ে তার প্রশাসনের কঠোর মনোভাবের কথা স্পষ্ট করেন। এর আগে হোয়াইট হাউসে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনেও তিনি ঠিক একই ধরনের দাবি অত্যন্ত জোর দিয়ে তুলে ধরেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ওই বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, তার বিশ্বাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নিজেদের এই আধিপত্য ভবিষ্যতেও সফলভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হবে। তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি অত্যন্ত নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন যে, ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে যে কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, আন্তর্জাতিক মহলে সবাই সেটিকে একটি দুর্ভেদ্য ‘ইস্পাতের প্রাচীর’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবরোধের বিপরীতে ইরানের কার্যত আর কিছুই করার সক্ষমতা অবশিষ্ট নেই।
ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, ইরান এখন কেবল বড় বড় কথাই বলে, কিন্তু বাস্তবে তারা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আর কোনোভাবেই উৎপীড়ক বা আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে টিকে নেই। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়টি হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার এই কড়া বার্তার একেবারে শেষ অংশে অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে যোগ করেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর!’
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই একতরফা দাবির বিপরীতে বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্রের এহেন কড়া বিবৃতি ও অবরোধ সত্ত্বেও ইরান এই কৌশলগত প্রণালীটির ওপর নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
বিশেষ করে এই জলপথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা কাঠামোর রূপরেখা নিয়ে ইরান বর্তমানে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ওমানের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ওমানের মধ্যকার এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর পরিসরে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা আপাতত পুরোপুরি স্থগিত হয়ে রয়েছে।
কারণ, ইরান ও ওমানের মধ্যকার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটনকে সম্পূর্ণভাবে বাইরে রাখা হয়েছে, যা মার্কিন প্রশাসনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে পুনরায় স্বাভাবিক জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ইরান তাদের নিজস্ব কঠোর শর্তের কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে
যে, যতক্ষণ পর্যন্ত না যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করছে, ইরানের ওপর আরোপিত সমস্ত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে আটকে থাকা তাদের সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুরোপুরি অবমুক্ত না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা এই প্রণালী দিয়ে কোনোভাবেই পূর্ণমাত্রায় বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো যান চলাচলের অনুমতি প্রদান করবে না। ইরানের এই অনড় অবস্থান গোটা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও ঘোলাটে করে তুলেছে।
এই চলমান সংঘাত এবং উভয় পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স তাদের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে মাত্র আটটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে।
অথচ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে স্বাভাবিক সময়ে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ নিয়মিতভাবে যাতায়াত করত। বর্তমানের এই পরিসংখ্যান যুদ্ধ-পূর্ববর্তী হারের চেয়ে কল্পনাতীত রকমের কম, যা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য একটি অশনিসংকেত।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচল বিশ্লেষণকারী স্বনামধন্য প্ল্যাটফর্ম ‘কেপলার’-এর সর্বশেষ সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এই জলপথে জাহাজ চলাচলের বর্তমান হার গত দশ দিনের গড় হিসাবের চেয়েও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় নিচে নেমে গেছে।
গত দশ দিনে এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২টি জাহাজ চলাচল করেছিল, যা মঙ্গলবারে এসে আরও হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ার গভীর আশঙ্কা রয়েছে।