ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, "এই অচলাবস্থা চলছে কারণ ডেমোক্র্যাটরা জানেই না তারা কী করছে। আমি জানি না তাদের কী সমস্যা হয়েছে। তারা উন্মাদ উন্মত্তে পরিণত হয়েছে।"
ট্রাম্পের এই কঠোর মন্তব্য এমন এক সংকটময় মুহূর্তে এলো, যখন এই অচলাবস্থার কারণে লক্ষ লক্ষ আমেরিকান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছেন। ১ নভেম্বর, শনিবার থেকেই, দেশজুড়ে প্রায় ৪ কোটি ২০ লক্ষ নিম্ন-আয়ের মানুষ 'সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম' (স্ন্যাপ) বা ফুড স্ট্যাম্পের আওতায় নভেম্বর মাসের জন্য নির্ধারিত কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না। তহবিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিটি স্থগিত হয়ে গেছে, যা লক্ষ লক্ষ পরিবারকে অনাহারের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের সাথে আলোচনার জন্য একটি কঠোর শর্ত আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন যে তিনি আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক, তবে তার আগে ডেমোক্র্যাটদের অবশ্যই সরকারকে সচল করতে হবে। "আমি সবসময় আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক; তাদের শুধু দেশকে সচল করতে হবে। তারা দেশকে সচল করুক এবং আমরা আলোচনায় বসব। আমরা খুব দ্রুতই বসব," তিনি বলেন।
এই রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মার্কিন সেনেট, যেখানে কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না। গত ৩১ দিন ধরে, রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত সেনেট সরকারের তহবিল চালুর জন্য একটি বিল পাসের চেষ্টা করে আসছে, কিন্তু বারবারই তা ব্যর্থ হচ্ছে। শুক্রবার পর্যন্ত, এই বিলটি মোট ১৩ বার সেনেটে উত্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিবারই তা প্রয়োজনীয় ৬০ ভোটের কোঠা পার হতে পারেনি।
মার্কিন সেনেটের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো বিল নিয়ে বিতর্ক বন্ধ করতে এবং চূড়ান্ত ভোটের জন্য অগ্রসর হতে ১০০ সদস্যের সেনেটে ৬০টি ভোটের প্রয়োজন হয়, যা 'ফিলিবাস্টার' ভাঙার থ্রেশহোল্ড নামে পরিচিত। রিপাবলিকানরা সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও, তাদের এককভাবে এই ৬০ ভোট নেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, "সবকিছুই তাদের (ডেমোক্র্যাটদের) দোষ। এর সমাধান খুব সহজ। আপনারা জানেন, বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট ইতোমধ্যেই এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, কিন্তু রিপাবলিকানরা খুব ঐক্যবদ্ধ।"
বাস্তব চিত্রটি অবশ্য আরও জটিল। সেনেটে রিপাবলিকানরা প্রায় সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ হলেও, কেন্টাকির সেনেটর র্যান্ড পলের মতো কিছু কট্টর রক্ষণশীল ঋণের বোঝা বাড়ানোর যুক্তিতে এই বিলের বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরাও প্রায় সবাই এই বিলের বিরুদ্ধে একজোট। তবে, পেনসিলভানিয়ার জন ফেটারম্যান এবং নেভাডার ক্যাথরিন কর্টেজ মাস্টোর মতো হাতেগোনা দু-একজন ডেমোক্র্যাট সেনেটর এবং মেইনের স্বতন্ত্র সেনেটর অ্যাঙ্গাস কিং রিপাবলিকানদের সাথে যোগ দিয়ে বিলটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
কিন্তু এই স্বল্প সমর্থন অচলাবস্থা ভাঙার জন্য যথেষ্ট নয়। রিপাবলিকান নেতৃত্ব এখন সরকার পুনরায় সচল করার জন্য অন্তত পাঁচজন "যুক্তিবাদী" ডেমোক্র্যাটকে তাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানাচ্ছেন। গত ১ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ অর্থবছরের বাজেট কংগ্রেস অনুমোদন করতে ব্যর্থ হওয়ায় এই অচলাবস্থা শুরু হয়। এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে দুই দলের মধ্যকার গভীর মতপার্থক্য।
ডেমোক্র্যাটরা 'ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট'-এর অধীনে চালু হওয়া স্বাস্থ্য বীমা ভর্তুকি অব্যাহত রাখাসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যয় বাড়াতে চায়। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা ফেডারেল ব্যয় হ্রাস, বিদেশি সহায়তায় ব্যাপক কাটছাঁট এবং ডেমোক্র্যাটদের প্রবর্তিত বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাতিলের দাবিতে সোচ্চার। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অচলাবস্থাকে ডেমোক্র্যাটদের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন, যার মাধ্যমে তিনি তার অপছন্দের কর্মসূচিগুলোতে অর্থায়ন বন্ধ করতে পারবেন।
রাজনৈতিক এই টানাপোড়েনের সরাসরি ও বিধ্বংসী প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। ফুড স্ট্যাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়াও, প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ৯ লক্ষ ফেডারেল কর্মচারী বর্তমানে অবৈতনিক ছুটিতে বা বেতন ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এক মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় বহু সরকারি কর্মচারী জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং দেশজুড়ে ফুড ব্যাংক বা দাতব্য খাদ্য ভাণ্ডারগুলোতে তাদের ভিড় বাড়ছে।
'উইমেন, ইনফ্যান্টস অ্যান্ড চিলড্রেন' (ডব্লিউআইসি) কর্মসূচির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মা ও শিশুকেও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। যদিও এই কর্মসূচির তহবিল নভেম্বর মাস পর্যন্ত চলবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এই crucial সহায়তাও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই অচলাবস্থা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম। এর আগে ২০১৮-১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনামলেই সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণ নিয়ে মতবিরোধের জেরে ৩৪ দিন ধরে সরকার আংশিকভাবে বন্ধ ছিল, যা এখন পর্যন্ত দীর্ঘতম শাটডাউন। বর্তমান অচলাবস্থা সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে এগোচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় এই অচলাবস্থা সহজে কাটছে না। হোয়াইট হাউস এবং কংগ্রেসের এই অনড় অবস্থান কেবল রাজনৈতিক বিভাজনকেই গভীর করছে না, বরং লক্ষ লক্ষ আমেরিকান নাগরিকের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে, যাদের দৈনন্দিন খাদ্য ও জীবিকা এখন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।