এই অপ্রত্যাশিত ও হৃদয়বিদারক হারের পর স্কালোনির ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে যখন নানামুখী জল্পনাকল্পনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই তাঁর পাশে এসে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছেন আর্জেন্টিনার সাবেক অধিনায়ক এবং রক্ষণভাগের কিংবদন্তি খেলোয়াড় হাভিয়ের জানেত্তি।
হাভিয়ের জানেত্তি কেবল একজন সাবেক তারকা খেলোয়াড়ই নন, বরং আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের কারণে তাঁর প্রতিটি মন্তব্য দেশের ফুটবল অঙ্গনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
তাঁর মতে, একটি শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে পরাজয়ের কারণে স্কালোনিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, স্কালোনি এবং তাঁর পুরো প্রশিক্ষক দলকে জাতীয় দলের দায়িত্বে সসম্মানে বহাল রাখা উচিত।
লিওনেল স্কালোনির সুদক্ষ নির্দেশনায় আর্জেন্টিনা দল গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করেছে, তা দলটির ইতিহাসে রীতিমতো এক সোনালি অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, তাঁর তত্ত্বাবধানে আর্জেন্টিনা মোট পাঁচটি বড় মাপের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে চারটিতেই চূড়ান্ত পর্বে বা ফাইনালে ওঠার অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছে। এর মধ্যে তিনটিতেই তারা পরম আরাধ্য শিরোপা নিজেদের ঘরে তুলেছে।
২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অধিকার করাটাই ছিল স্কালোনির মেয়াদে দলটির সবচেয়ে হতাশাজনক ফলাফল। এরপর থেকে দলটিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টানা দুবার কোপা আমেরিকার মহাদেশীয় শিরোপা জয় করে আলবিসেলেস্তেরা বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তি হিসেবে প্রমাণ করে।
আর্জেন্টিনা দলের সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে বড় পালকটি যুক্ত হয় ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। বিশ্ব ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসির জাদুকরি নেতৃত্বে এবং স্কালোনির তীক্ষ্ণ রণকৌশলে দীর্ঘ ছত্রিশ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে আর্জেন্টিনা।
সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই দলটি ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও দাপটের সঙ্গে ফাইনালে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত চরম উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে স্পেনের কাছে মাত্র ১-০ গোলের ব্যবধানে হেরে যায় তারা।
পুরো প্রতিযোগিতায় দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেওয়ার পরও শিরোপা নির্ধারণী মঞ্চে স্প্যানিশ দলের সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ ও গতিশীল আক্রমণের কাছে শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হতে হয় আলবিসেলেস্তেদের। এই একটি মাত্র গোলই তাদের টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার এই তীব্র বেদনা কেবল খেলোয়াড়দেরই নয়, বরং দলের প্রধান কোচ হিসেবে স্কালোনিকেও গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। ফাইনাল ম্যাচের পর আয়োজিত আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
বিশ্বজয়ের স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় তিনি উপস্থিত গণমাধ্যমের সামনেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। চোখের জল সামলাতে না পেরে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি জানান যে, জাতীয় দলের হয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সভাপতি ক্লাউদিও তাপিয়ার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বসবেন।
স্কালোনির এই মন্তব্য তাঁর সম্ভাব্য পদত্যাগের গুঞ্জনকে ক্রীড়া মহলে আরও জোরালো করে তোলে। ঠিক এমন এক সংকটময় ও উত্তেজনাকর মুহূর্তে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান সম্পূর্ণ পরিষ্কার করেছেন ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলানের সাবেক তারকা ও আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি হাভিয়ের জানেত্তি।
তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, স্কালোনির বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে জাতীয় দলটি বর্তমানে একদম সঠিক পথে অগ্রসর হচ্ছে। জানেত্তি নিজের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, তিনি আন্তরিকভাবে আশা করেন লিওনেল স্কালোনি এবং তাঁর পুরো কারিগরি দল যেন নিজেদের দায়িত্বে বহাল থাকেন।
কারণ হিসেবে তিনি জানান, জাতীয় দলের বর্তমান দায়িত্ব এমন কিছু যোগ্য, পরীক্ষিত ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষের হাতে ন্যস্ত রয়েছে, যাদের ওপর দেশের আপামর জনসাধারণ ও অগণিত সমর্থকেরা পুরোপুরি ভরসা করতে পারেন।
আগামী ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবরের মধ্যে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিমূলক ম্যাচে মাঠে নামতে যাচ্ছে। ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই ম্যাচগুলোর আগেই স্কালোনি এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানের মধ্যে সেই বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।
এখন সমগ্র ফুটবল বিশ্ব এবং আর্জেন্টিনার অগণিত সমর্থক অধীর আগ্রহে সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছেন। দলের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ সাফল্যের স্বার্থে বর্তমান প্রশিক্ষক পর্ষদকে ধরে রাখা কতটা জরুরি, জানেত্তির মন্তব্য তারই এক জোরালো প্রতিধ্বনি। ফুটবল ফেডারেশনের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই কিংবদন্তির প্রকাশ্য সমর্থন একটি অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।