দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের বন্দর খামির শহরে মার্কিন হামলায় তিন নিরীহ গ্রামবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, মাতৃভূমির প্রতি ইঞ্চি ভূখণ্ড রক্ষায় তারা শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, চলমান এই অসম সংঘাতে বেসামরিক প্রাণহানি বৃদ্ধির বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
গত শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ ও আবেগঘন বার্তায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমোজগান প্রদেশে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে নিশ্চিত করেন যে, বন্দর খামির শহরের একটি স্থানীয় সেতু পার হওয়ার সময় আকস্মিক মার্কিন বিমান হামলার শিকার হয়ে ওই তিন নিরীহ গ্রামবাসী ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান।
এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, নিহত ওই সাধারণ মানুষেরা সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন এবং চলমান সামরিক সংঘাতের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল না।
তিনি সমগ্র জাতির উদ্দেশে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন যে, এই নিরীহ নাগরিকদের ঝরে পড়া রক্ত কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেওয়া হবে না এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নিজেদের অধিকার অনুযায়ী এর চূড়ান্ত জবাব দেওয়া হবে।
মার্কিন বাহিনীর এই ধারাবাহিক ও ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার পেছনের অন্যতম মূল কারণ হলো, বেসামরিক অবকাঠামো এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর আগ্রাসনের মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া।
বন্দর খামির শহরের যে সেতুটিতে হামলা চালানো হয়েছে, সেটি ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। নিরীহ গ্রামবাসীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন ইরানের নীতিনির্ধারকরা।
এর আগে হরমোজগান প্রদেশেই সুপেয় পানি সরবরাহের একটি প্রধান পাম্পিং স্টেশনে মার্কিন হামলার জেরে হাজার হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছিলেন। ধারাবাহিক এসব ঘটনার প্রেক্ষিতেই মূলত তেহরানের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন চরম ও আপসহীন প্রতিরক্ষামূলক বার্তা দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মাতৃভূমির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দেশপ্রেমের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও কড়া ভাষায় বলেন, উত্তর থেকে দক্ষিণ এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম-সমগ্র ইরান তাদের পবিত্র মাতৃভূমি।
এই মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করার প্রশ্নই ওঠে না। দেশের মাটি ও মানুষের সার্বিক সুরক্ষায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং সাধারণ জনগণ তাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রতিটি ইঞ্চি ভূখণ্ড রক্ষা করতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি আগ্রাসী শক্তিকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দেন।
তার এই জোরালো বক্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, চরম সামরিক ও ভূরাজনৈতিক চাপের মুখেও তেহরান কোনোভাবেই পিছু হটবে না। এদিকে, এই সামরিক আগ্রাসনের ফলে ইরানে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের এক ভয়াবহ চিত্র আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছে দেশটির স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও চিকিৎসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ও ধারাবাহিক বিমান হামলাগুলোতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮ জন সাধারণ নাগরিক নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি এই ধ্বংসাত্মক হামলাগুলোতে চার শতাধিক মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, যাদের অনেকের অবস্থাই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
আহতদের স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, তবে ক্রমাগত হামলা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটের কারণে সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও এক চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক স্থাপনার বাইরে সাধারণ মানুষ এবং বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর এ ধরনের প্রাণঘাতী হামলা চলমান এই দ্বিপাক্ষিক সংঘাতকে একটি আঞ্চলিক বা সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে বিপজ্জনকভাবে ধাবিত করছে।
টানা কয়েক দিন ধরে চলা বিমান হামলায় শুধু যে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে তা নয়, বরং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামোগুলোও সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে।
এমন এক চরম অস্থিতিশীল ও ভয়ংকর পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির এই আপসহীন ও কঠোর অবস্থান মূলত সমগ্র জাতির ঐক্য, দেশপ্রেম এবং যেকোনো মূল্যে বিদেশি আগ্রাসন প্রতিরোধের এক সম্মিলিত জাতীয় সংকল্পের স্পষ্ট প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ক্রমবর্ধমান রক্তপাত এবং বেসামরিক প্রাণহানি নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করলেও, নিকট ভবিষ্যতে এই সংঘাত থামার কোনো বাস্তব ও কার্যকর ইঙ্গিত এখনো বৈশ্বিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।