ইরানের জ্যেষ্ঠ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সম্প্রতি এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কঠোর সিদ্ধান্তের কথা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক ফ্রন্টেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন সর্বকালের সবচেয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির শর্তাবলির চরম অবমূল্যায়ন এবং একতরফাভাবে তা বাতিলের চেষ্টার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ইরান এই পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে।
ইরানের স্থানীয় এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ-এর সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি এই চুক্তি স্থগিতের পেছনের বিস্তারিত কারণ এবং সামগ্রিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের আওতায় থাকা তাদের নিজেদের সমস্ত আইনি, নৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে। ওয়াশিংটনের এই ধারাবাহিক দায়িত্বহীন আচরণ এবং ক্রমাগত চুক্তিভঙ্গের ফলেই কার্যকারিতা হারিয়ে এই সমঝোতা স্মারকটি কার্যত একটি স্থবির ও অর্থহীন নথিতে পরিণত হয়েছিল।
একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের এমন চরম অবজ্ঞা এবং দ্বৈত নীতির তীব্র সমালোচনা করে তিনি জানান যে, তেহরানের পক্ষে আর কোনোভাবেই এই একতরফা এবং অসম চুক্তি মেনে চলা সম্ভব নয়।
যখন চুক্তির একটি পক্ষ ক্রমাগতভাবে এর শর্তগুলো লঙ্ঘন করে চলেছে, তখন অপর পক্ষের জন্য তা বিনাবাক্যে মেনে চলা কেবল জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থিই নয়, বরং তা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য অপমানজনকও বটে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রকাশ্য চুক্তি লঙ্ঘনের সরাসরি ও তাৎক্ষণিক জবাব হিসেবে ইরানও এখন থেকে ওই চুক্তির আওতায় থাকা নিজেদের সমস্ত প্রতিশ্রুতি এবং এর আনুষঙ্গিক বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করার চূড়ান্ত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দৃঢ়তার সঙ্গে জানান গারিবাবাদি।
বর্তমানের এই চরম অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বহুপাক্ষিক বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির চেয়ে দেশের সার্বিক নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে ইরানের নীতি-নির্ধারক মহল। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে তাদের প্রধান ও একমাত্র মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হলো মাতৃভূমিকে রক্ষা করা এবং যেকোনো বিদেশি সামরিক আগ্রাসন থেকে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা সুরক্ষিত রাখা।
যখন দেশের সাধারণ মানুষের জীবন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পতিত, তখন কাগজে-কলমে থাকা কোনো চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকের চেয়ে জাতীয় প্রতিরক্ষাই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পরিচালিত ধারাবাহিক বিমান হামলা এবং সামরিক আগ্রাসনের ফলে পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি এক ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করেছে।
সামরিক এই সংঘাতের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বেসামরিক প্রাণহানি ঘটতে থাকায় ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। গারিবাবাদি তার সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি তুলে ধরে বলেন, চলমান এই ভয়াবহ সামরিক পরিস্থিতি ও অঘোষিত যুদ্ধাবস্থার কারণে ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সকল স্তরে এখন সামরিক ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রমকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার প্রদান করছে।
দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আকাশসীমা ও সীমান্ত সুরক্ষা এবং সম্ভাব্য যেকোনো বৃহৎ হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণের মতো জরুরি কাজগুলো সম্পাদনের স্বার্থেই বর্তমান অবস্থায় ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের মতো কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চুক্তি বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা তেহরানের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে আরও বেশি জটিল, মেরুকৃত ও সংঘাতময় করে তুলবে। সামরিক ময়দানে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পাশাপাশি কূটনৈতিক টেবিলেও দুই দেশের এই চরম অনমনীয় অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নিকট ভবিষ্যতে এই সংকট সমাধানের কোনো বাস্তব ও শান্তিপূর্ণ সম্ভাবনা আপাতত দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।
ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক স্থগিত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে আস্থার যে সামান্য পারদটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা-ও যেন এখন চরম অনিশ্চয়তার অন্ধকারে চিরতরে তলিয়ে গেল। মাতৃভূমি রক্ষার পবিত্র ব্রত নিয়ে ইরানের এই কঠোর অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবিরাম ও একগুঁয়ে সামরিক চাপের ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে আরও গভীর ও ধ্বংসাত্মক সামরিক সংকটের দিকে ধাবিত হবে বলে জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও শান্তিকামী বিশ্ব।