শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তেহরানে কফিনবন্দি ট্রাম্প পরিবারের বিলবোর্ড

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম

তেহরানে কফিনবন্দি ট্রাম্প পরিবারের বিলবোর্ড
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও মার্কিন-ইরান ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি অত্যন্ত উসকানিমূলক ও বিতর্কিত বিলবোর্ড উন্মোচন করা হয়েছে। নতুন এই বিশালাকার বিলবোর্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পুরো পরিবারকে একটি মার্কিন পতাকায় মোড়ানো কফিনের ভেতর বন্দি অবস্থায় চিত্রিত করা হয়েছে।

 

হোয়াইট হাউসের জ্বলন্ত পটভূমিতে তৈরি এই বিলবোর্ডে ফার্সি ভাষায় অত্যন্ত কড়া একটি বার্তা লেখা হয়েছে, যার অর্থ ‘রক্তের বদলে রক্ত’। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ঘটনাটি ইতিমধ্যেই ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন প্রকাশ্য হুমকির মাধ্যমে তেহরান মূলত ওয়াশিংটনের প্রতি তাদের চরম প্রতিশোধস্পৃহা এবং আপসহীন অবস্থানের বার্তাটিই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পৌঁছে দিতে চাইছে।

 

রাজধানী তেহরানের অন্যতম ব্যস্ত ও জনবহুল এলাকা হিসেবে পরিচিত ভালিয়াসর স্কয়ারে স্থাপিত এই বিশাল বিলবোর্ডটিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশাপাশি ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং তাদের পাঁচ সন্তান-ইভাঙ্কা, ডন জুনিয়র, এরিক, টিফানি ও ব্যারন ট্রাম্পের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

 

ইরানের শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান ‘ওজ আর্টস অ্যান্ড মিডিয়া অর্গানাইজেশন’ এই চাঞ্চল্যকর দেয়ালচিত্রটির নকশা প্রণয়ন করেছে।

 

গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে ইরানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান তাদের আদর্শিক বার্তা প্রচার, যুদ্ধ স্মারক প্রদর্শন এবং প্রকাশ্য হুমকির জন্য দেশের জনবহুল উন্মুক্ত স্থানগুলোকে প্রচারণার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে।

 

তবে বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এমন প্রকাশ্য হুমকি দেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইনকিলাব চত্বরেও ঠিক একই ধরনের আরও একটি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছিল।

 

সেই বিলবোর্ডটিতে একটি খোলা কালো কফিনের ভেতর থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিথর দেহ উঁকি দিতে দেখা যায়। ওই চিত্রে তার চুল ছিল উসকোখুসকো, চোখ ও মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ অবস্থায় ছিল এবং ফোলা পেটের ওপর থাকা লাল টাইয়ের ওপর হাত দুটি রাখা ছিল।

 

কফিনের শেষ প্রান্তে তার পা দুটি সোজা ওপরের দিকে নির্দেশ করছিল। এই ধারাবাহিক দৃশ্যপটগুলো থেকে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, ইরান তাদের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে রাজপথের বিলবোর্ড পর্যন্ত প্রসারিত করেছে।

 

এদিকে, এই তীব্র উত্তেজনার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতবা খামেনি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামের নিজস্ব চ্যানেলে দেওয়া এক কড়া বার্তায় তিনি তার পিতা ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের চরম প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়া সমগ্র ইরানি জাতির একটি ন্যায্য দাবি এবং এটি যেকোনো মূল্যে নিশ্চিতভাবেই আদায় করা হবে।

 

তিনি আরও যুক্ত করেন যে, এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা বিছানায় শান্তিতে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে না, বরং তাদের অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়েই কবরে যেতে হবে। মোজতবা খামেনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই প্রতিশোধ গ্রহণ প্রক্রিয়া তার ব্যক্তিগত উপস্থিতি বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি একটি অবিচল রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।

 

অপরদিকে, ইরানের এই ধারাবাহিক হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অত্যন্ত কড়া ভাষায় পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের গুপ্তহত্যার তালিকায় রয়েছেন এবং মার্কিন প্রশাসনকে এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যদি কোনোভাবে তাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়, তবে তিনি আগে থেকেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ইরানে এমন মাত্রায় ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক বোমাবর্ষণের নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, যা তারা ইতিহাসে এর আগে কখনোই দেখেনি।

 

মূলত ইরানি সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। এই হুমকির মাত্রা এতটাই তীব্র যে, সম্প্রতি তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের পর যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পথে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণ পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন, যা হোয়াইট হাউস পরবর্তীতে নিরাপত্তার স্বার্থে গৃহীত কৌশল হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে।

 

দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের এই পাল্টাপাল্টি চরম হুমকি ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও একবার চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। স্বনামধন্য মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে মার্কিন ও ইসরায়েলি শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী দিনগুলোতে ইসরায়েলে বেশ কয়েক ডজন অত্যাধুনিক রিফুয়েলিং বা জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান পাঠাতে যাচ্ছে।

 

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক প্রস্তুতি মূলত ইরানজুড়ে আরও বড় ধরনের কোনো সর্বাত্মক সামরিক অভিযান চালানোর একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই অংশ। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে আগামীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন কোনো সামরিক হামলার নির্দেশ দিলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

 

- এনডিটিভি, অ্যাক্সিওস